কৃষকের সারপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে
- আপডেট সময় : ০৬:১৭:৩৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬
- / ৯৯৯ বার পড়া হয়েছে
কৃষকের সারপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে
স্টাফ রিপোর্টারঃ
কৃষকের ঘামেই দেশের খাদ্যভান্ডার পূর্ণ হয়। অথচ সেই কৃষকেরই ফসল উৎপাদনের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় উপকরণ সার সংগ্রহ করতে গিয়ে যদি লাইনে দাঁড়াতে হয়, নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি টাকা গুনতে হয় কিংবা খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হয়, তাহলে কৃষি ব্যবস্থাপনার সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
সরকার কৃষকের জন্য ভর্তুকি দিয়ে সার সরবরাহ করে, সরকারি গুদামে সার মজুত রাখে, ডিলারদের মাধ্যমে তা কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করে, এটা ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা যদি হয় সার আছে, কৃষক পাচ্ছেন না, তাহলে সমস্যাটি শুধু সারের নয়। এটি ব্যবস্থাপনারও।
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন এলাকায় সারের সংকট, বাড়তি দামে বিক্রি এবং কৃষকের দুর্ভোগের অভিযোগ সামনে এসেছে। কোথাও সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ, কোথাও আবার পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও কৃষকের হাতে সার না পৌঁছানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে বাড়তি দাম নেওয়া হলেও রসিদ দেওয়া হচ্ছে না। অথচ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার দাবি, সেখানে চাহিদা অনুযায়ী সারের বরাদ্দ রয়েছে।
এদিকে দোকানিরা সার নেই বললেও জেলা কৃষি বিভাগ পর্যাপ্ত মজুত থাকার কথা জানিয়েছে। প্রশ্ন তাই একটাই সরকারি বরাদ্দ ও মজুত থাকার পরও কৃষককে কেন বাড়তি দামে সার কিনতে হবে? সংকটটা কি সত্যিই সারের, নাকি সার কৃষকের হাতে পৌঁছানোর ব্যবস্থাতেই বড় কোনো গলদ রয়েছে?
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সংকটের সময় কৃষককে অসহায় অবস্থায় পড়তে হয়। জমিতে সার দেওয়ার নির্দিষ্ট সময় আছে। সে সময় পেরিয়ে গেলে শুধু সার না পাওয়ার ক্ষতি নয়, ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে। ফলে কৃষকের হাতে দরকষাকষির সুযোগ থাকে না। প্রয়োজনের তাগিদে তাকে বেশি দামেই সার কিনতে হতে পারে। বাজারের এ দুর্বল অবস্থানই অসাধু ব্যবসায়ীদের জন্য সুযোগ তৈরি করে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যদি সরকারি গুদামে সার থাকে, তাহলে কৃষকের কাছে সেই সার পৌঁছায় না কেন?
এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার দিকে তাকাতে হবে। সরকার কত সার আমদানি করছে, কোন জেলায় কত বরাদ্দ দিচ্ছে, কোন ডিলার কত পাচ্ছেন, কখন গুদাম থেকে সার বের হচ্ছে, কত দামে বিক্রি হচ্ছে প্রতিটি ধাপের তথ্য যদি স্বচ্ছ না হয়, তাহলে মাঝপথে অনিয়মের সুযোগ থেকেই যায়। সাম্প্রতিক একটি ঘটনায় বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে।
ভূরুঙ্গামারীতে একটি ডিলারের গুদামের দরজা ভেঙে বস্তা বস্তা সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেখানে প্রায় ১০ হাজার কেজি সার নেওয়ার ঘটনা ঘটে এবং পরে ৩৩ জন কৃষক সার ফেরত দিয়েছেন; তাদের মধ্যে ১৯৭ বস্তা সার নিয়ে যাওয়ার তথ্যও এসেছে। এ ধরনের ঘটনা শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে মূল সমস্যাটি আড়ালে থেকে যাবে।
কেন কৃষকের মধ্যে এমন মরিয়া পরিস্থিতি তৈরি হলো? কেন একজন কৃষক মনে করলেন, সার পাওয়ার জন্য তাকে গুদামের দরজা ভাঙার পর্যায়ে যেতে হবে? অবশ্যই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু এমন পরিস্থিতির পেছনে থাকা সংকটটিও অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
কৃষকের প্রয়োজন ও সরবরাহের মধ্যে যদি বড় ব্যবধান তৈরি হয়, তাহলে বাজারে স্বাভাবিকভাবেই চাপ বাড়ে। সে চাপ যদি সময়মতো প্রশাসনের নজরে না আসে, তাহলে সংকট আরও তীব্র হয়। তাই শুধু সংকটের পর অভিযান চালানো নয়, সংকট তৈরি হওয়ার আগেই তা শনাক্ত করা দরকার। সরকারি সার বিতরণ ব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তথ্যের স্বচ্ছতা। প্রতিটি জেলায় কত সার বরাদ্দ হয়েছে, কোন উপজেলায় কত গেছে, কোন ডিলার কত পেয়েছেন এবং কত সার বিক্রি হয়েছে এসব তথ্য জনসম্মুখে থাকা উচিত।
কৃষক যেন নিজের মোবাইল ফোন থেকেই জানতে পারেন, তার এলাকার ডিলারের কাছে কত সার বরাদ্দ হয়েছে এবং সরকার নির্ধারিত দাম কত। এতে দুটি সুবিধা হবে। প্রথমত, কৃষক নিজের অধিকার সম্পর্কে জানতে পারবেন। দ্বিতীয়ত, ডিলার বা ব্যবসায়ীর পক্ষেও অনিয়ম করা কঠিন হবে। কারণ বরাদ্দ ও বিক্রির তথ্য যদি সবার সামনে থাকে, তাহলে অতিরিক্ত দাম নেওয়া বা সার গোপন করে রাখার মতো ঘটনা সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব। শুধু তথ্য প্রকাশ করলেই অবশ্য সব সমস্যার সমাধান হবে না।
প্রয়োজন কার্যকর নজরদারি। ডিলারশিপ দেওয়ার পর তার কার্যক্রম নিয়মিত যাচাই করতে হবে। কোনো ডিলার সরকারি বরাদ্দের সার অন্যত্র পাচার করছেন কি না, মজুত করছেন কি না, নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি নিচ্ছেন কি না, এসব নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। কালোবাজারি বা মজুতদারির প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও ভাবতে হবে। কারণ শুধু জরিমানা করে ছেড়ে দিলে অনেক সময় তা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে না। অনিয়ম যদি লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়, তাহলে শাস্তির ভয়ও কার্যকর থাকে না। প্রয়োজনে ডিলারশিপ বাতিল, লাইসেন্স স্থগিত এবং আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
মনে রাখতে হবে, কৃষকের সারপ্রাপ্তি কোনো দয়া নয়, এটি তার ন্যায্য অধিকার। তাই সারের সংকট নেই এমন আশ্বাস নয়; প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে কৃষক নির্ধারিত সময়ে, নির্ধারিত দামে প্রয়োজনীয় সার কিনে বাড়ি ফিরতে পারেন। কৃষকের জমিতে সময়মতো সার পৌঁছানো মানে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, বাজারের স্থিতিশীলতা এবং কৃষকের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা।
শিক্ষার্থী, সুমাইয়া সিরাজ সিমি, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।
আস্থা/এমএইচ
















