ঢাকা ০৬:৪৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬, ১১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তৌহিদী জনতার আড়ালে রাজনীতি

Astha DESK
  • আপডেট সময় : ০৬:১৪:৫০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬
  • / ৯৯৯ বার পড়া হয়েছে

তৌহিদী জনতার আড়ালে রাজনীতি

স্টাফ রিপোর্টারঃ

‘তৌহিদী’ বলতে আল্লাহর একত্ববাদ প্রচার ও ধারণকারী বোঝায়। সেই অর্থে সব মুসলিমই তৌহিদী জনতা। কিন্তু ২০২৪-এর ৫ আগস্টের পর তৌহিদী জনতার ব্যানারে বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে একাধিক ইস্যুকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ, আন্দোলন ও সংঘর্ষ হয়েছে। যেখানে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের অংশগ্রহণ নেই।

বিভিন্ন ধর্মীয় রাজনৈতিক দলের উগ্র কর্মী-সমর্থকরা এসব কর্মকাণ্ড ঘটিয়েছে। তারা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বিনোদন অঙ্গনের নারী তারকা ও ব্যক্তিত্বদের অংশগ্রহণে বাধা দিয়েছে। শান্তির ধর্ম ইসলামের নামে অশান্তি করেছে। মাজার, গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের কার্যালয়ে হামলা করেছে। সামাজিক ঐতিহ্য ও আবহমানকালের বাঙালি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে জেহাদি জোশ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের নড়বড়ে প্রশাসন বারবার ব্যর্থ হয়েছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে। উল্টো সমর্থনের অভিযোগ রয়েছে তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে।

ছয় মাস আগে নির্বাচিত বিএনপি সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয়। সাধারণ মানুষ আশা করেছিল, এবার তৌহিদী জনতার নামে উগ্রতার রাশ টেনে ধরা হবে। কিন্তু সে আশা এখনো পুরোপুরি পূরণ হয়নি। বিভিন্ন সময় নানা অপ্রয়োজনীয় ইস্যুকে কেন্দ্র করে হিংসাত্মক কর্মকাণ্ডে উসকানি দিচ্ছে মতলবাজরা।

সম্প্রতি সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার সোনাই নদীতে নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি জানিয়েছে ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে কিছু লোক।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়, উপজেলার লাউতা ও বাহাদুরপুর গ্রামের যুব সমাজের উদ্যোগে দীর্ঘদিন ধরে নৌকাবাইচ হয়ে আসছে। এবারও বার্ষিক নৌকাবাইচের আয়োজন করা হয়েছে ২৮ আগস্ট।

চলতি বছর নৌকাবাইচের বিষয়টি প্রচার হওয়ার পরপরই এক সপ্তাহ ধরে ‘লাউতা ইউনিয়ন তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে কিছু ব্যক্তি প্রতিযোগিতাটি বাতিলের দাবি জানিয়ে ফেসবুকে প্রচার চালাচ্ছে। পাশাপাশি একই ব্যানারে স্থানীয় বারইগ্রাম বাজার মসজিদে সভা করেও তারা এ দাবি জানিয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে বিয়ানী বাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে হাবিবা মজুমদার বলেন, এখানে ঐতিহ্যগতভাবেই দীর্ঘদিন ধরে নৌকাবাইচ হয়ে আসছে। সম্প্রতি এক ‘হুজুর’ এটা নিয়ে বলেছেন, গ্রামীণ এ আয়োজনে প্রায়ই মারধর হয়। তাই এ বাইচ না হওয়ার দাবি করেছেন তিনি।

ইউএনও আরও বলেন, ‘নৌকাবাইচের কারণে নদীর পাড়, আবাদি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গত বছরও মারধরের কারণে বাইচ হয়নি। সেই দিক বিবেচনায় নিয়ে এক পক্ষ চাচ্ছে নৌকাবাইচ বন্ধ হোক। তবে আরেক পক্ষ চাচ্ছে বাইচ হোক। উভয় পক্ষকে নিয়ে বসে সমাধানের জন্য স্থানীয় চেয়ারম্যানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।’

অদ্ভুত ও উদ্ভট যুক্তিতে ওই এলাকার উৎসবমুখর সাধারণ মানুষ এখন ক্ষুব্ধ এবং শঙ্কিত। আল্লাহর একত্ববাদের সঙ্গে নৌকাবাইচের কোনো বিরোধ নেই বলেই বিশ্বাস করে সচেতন সমাজ।

কিছুদিন আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বাধা দেওয়ার জেরে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। এতে পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। এ ঘটনার পর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পণ্ড হয়ে যায়। সে দিন রাত আড়াইটা পর্যন্ত শহরের বিভিন্ন সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা।

তারা পুলিশ সদস্যদের বিচার, কনসার্ট বন্ধসহ বিভিন্ন দাবি জানায়। পরে, উভয় পক্ষকে নিয়ে সভা করে পরিস্থিতি শান্ত করেন জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম।

এ বিষয়ে গণমাধ্যমের এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া এলাকাটিই এ রকম যে, গান, বাজনা, সিনেমা, এসব বহু বছর যাবৎ তাদের মধ্যে প্রায় নিষিদ্ধের মতো। সেখানকার পরিস্থিতি আলাদা। পরিবেশ-পরিস্থিতি বিবেচনায়, যেখানে যা ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, সেটি নিয়েছি।’ এই উত্তরে খুশি হতে পারেনি সাধারণ মানুষ।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আরও দায়িত্বশীল উদ্যোগ আশা করে দেশবাসী। জুলাই অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার প্রতিরোধের শিকার হয় পুলিশ। সেই ট্রমা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি তারা। নির্বাচিত সরকারের আমলে পুলিশের নির্দোষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পণ্ড হচ্ছে উগ্রতার কাছে। উল্টো পুলিশের বিচার দাবি করছে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা।

এদিকে, মাদক ও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে চিহ্নিত অভিযুক্তদের ধরতে না পারলে সংশ্লিষ্ট পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিষয়টি সাংঘর্ষিক হবে বলে মনে করে। লেখক; হেড অব নিউজ, আরটিভি।

আস্থা/এমএইচ

ট্যাগস :

তৌহিদী জনতার আড়ালে রাজনীতি

আপডেট সময় : ০৬:১৪:৫০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬

তৌহিদী জনতার আড়ালে রাজনীতি

স্টাফ রিপোর্টারঃ

‘তৌহিদী’ বলতে আল্লাহর একত্ববাদ প্রচার ও ধারণকারী বোঝায়। সেই অর্থে সব মুসলিমই তৌহিদী জনতা। কিন্তু ২০২৪-এর ৫ আগস্টের পর তৌহিদী জনতার ব্যানারে বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে একাধিক ইস্যুকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ, আন্দোলন ও সংঘর্ষ হয়েছে। যেখানে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের অংশগ্রহণ নেই।

বিভিন্ন ধর্মীয় রাজনৈতিক দলের উগ্র কর্মী-সমর্থকরা এসব কর্মকাণ্ড ঘটিয়েছে। তারা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বিনোদন অঙ্গনের নারী তারকা ও ব্যক্তিত্বদের অংশগ্রহণে বাধা দিয়েছে। শান্তির ধর্ম ইসলামের নামে অশান্তি করেছে। মাজার, গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের কার্যালয়ে হামলা করেছে। সামাজিক ঐতিহ্য ও আবহমানকালের বাঙালি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে জেহাদি জোশ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের নড়বড়ে প্রশাসন বারবার ব্যর্থ হয়েছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে। উল্টো সমর্থনের অভিযোগ রয়েছে তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে।

ছয় মাস আগে নির্বাচিত বিএনপি সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয়। সাধারণ মানুষ আশা করেছিল, এবার তৌহিদী জনতার নামে উগ্রতার রাশ টেনে ধরা হবে। কিন্তু সে আশা এখনো পুরোপুরি পূরণ হয়নি। বিভিন্ন সময় নানা অপ্রয়োজনীয় ইস্যুকে কেন্দ্র করে হিংসাত্মক কর্মকাণ্ডে উসকানি দিচ্ছে মতলবাজরা।

সম্প্রতি সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার সোনাই নদীতে নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি জানিয়েছে ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে কিছু লোক।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়, উপজেলার লাউতা ও বাহাদুরপুর গ্রামের যুব সমাজের উদ্যোগে দীর্ঘদিন ধরে নৌকাবাইচ হয়ে আসছে। এবারও বার্ষিক নৌকাবাইচের আয়োজন করা হয়েছে ২৮ আগস্ট।

চলতি বছর নৌকাবাইচের বিষয়টি প্রচার হওয়ার পরপরই এক সপ্তাহ ধরে ‘লাউতা ইউনিয়ন তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে কিছু ব্যক্তি প্রতিযোগিতাটি বাতিলের দাবি জানিয়ে ফেসবুকে প্রচার চালাচ্ছে। পাশাপাশি একই ব্যানারে স্থানীয় বারইগ্রাম বাজার মসজিদে সভা করেও তারা এ দাবি জানিয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে বিয়ানী বাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে হাবিবা মজুমদার বলেন, এখানে ঐতিহ্যগতভাবেই দীর্ঘদিন ধরে নৌকাবাইচ হয়ে আসছে। সম্প্রতি এক ‘হুজুর’ এটা নিয়ে বলেছেন, গ্রামীণ এ আয়োজনে প্রায়ই মারধর হয়। তাই এ বাইচ না হওয়ার দাবি করেছেন তিনি।

ইউএনও আরও বলেন, ‘নৌকাবাইচের কারণে নদীর পাড়, আবাদি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গত বছরও মারধরের কারণে বাইচ হয়নি। সেই দিক বিবেচনায় নিয়ে এক পক্ষ চাচ্ছে নৌকাবাইচ বন্ধ হোক। তবে আরেক পক্ষ চাচ্ছে বাইচ হোক। উভয় পক্ষকে নিয়ে বসে সমাধানের জন্য স্থানীয় চেয়ারম্যানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।’

অদ্ভুত ও উদ্ভট যুক্তিতে ওই এলাকার উৎসবমুখর সাধারণ মানুষ এখন ক্ষুব্ধ এবং শঙ্কিত। আল্লাহর একত্ববাদের সঙ্গে নৌকাবাইচের কোনো বিরোধ নেই বলেই বিশ্বাস করে সচেতন সমাজ।

কিছুদিন আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বাধা দেওয়ার জেরে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। এতে পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। এ ঘটনার পর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পণ্ড হয়ে যায়। সে দিন রাত আড়াইটা পর্যন্ত শহরের বিভিন্ন সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা।

তারা পুলিশ সদস্যদের বিচার, কনসার্ট বন্ধসহ বিভিন্ন দাবি জানায়। পরে, উভয় পক্ষকে নিয়ে সভা করে পরিস্থিতি শান্ত করেন জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম।

এ বিষয়ে গণমাধ্যমের এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া এলাকাটিই এ রকম যে, গান, বাজনা, সিনেমা, এসব বহু বছর যাবৎ তাদের মধ্যে প্রায় নিষিদ্ধের মতো। সেখানকার পরিস্থিতি আলাদা। পরিবেশ-পরিস্থিতি বিবেচনায়, যেখানে যা ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, সেটি নিয়েছি।’ এই উত্তরে খুশি হতে পারেনি সাধারণ মানুষ।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আরও দায়িত্বশীল উদ্যোগ আশা করে দেশবাসী। জুলাই অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার প্রতিরোধের শিকার হয় পুলিশ। সেই ট্রমা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি তারা। নির্বাচিত সরকারের আমলে পুলিশের নির্দোষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পণ্ড হচ্ছে উগ্রতার কাছে। উল্টো পুলিশের বিচার দাবি করছে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা।

এদিকে, মাদক ও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে চিহ্নিত অভিযুক্তদের ধরতে না পারলে সংশ্লিষ্ট পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিষয়টি সাংঘর্ষিক হবে বলে মনে করে। লেখক; হেড অব নিউজ, আরটিভি।

আস্থা/এমএইচ