ঢাকা ০১:৩৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ২ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দিনে ১০টি খুন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ

Astha DESK
  • আপডেট সময় : ১২:২৪:৩৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
  • / ১০২৭ বার পড়া হয়েছে

দিনে ১০টি খুন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ

 

স্টাফ রিপোর্টার:

রাজনৈতিক কোন্দল, আন্ডারওয়ার্ল্ডের আধিপত্য বিস্তারের লড়াই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সংঘর্ষে দেশজুড়ে খুন, টার্গেট কিলিং বন্দুক হামলার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন মাসে সারা দেশে ৯শ ১৫টি হত্যাকাণ্ডের মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন ১০টিরও বেশি খুনের ঘটনা ঘটেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের বিস্তার, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দুর্বলতা এবং ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শীর্ষ অপরাধীদের মুক্তি ও দেশে ফিরে আসা সহিংসতা বাড়ার মূল কারণ। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল এখন রাজপথে এসে ঠেকেছে। ক্ষমতার লড়াইয়ে অপরাধী গোষ্ঠীগুলোকে ব্যবহার করা হচ্ছে, যার ফলে দেশজুড়ে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা ও হত্যাকাণ্ড ঘটছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মোট ৯শ ১৫টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণের ঠিক পরপরই, অর্থাৎ মার্চ মাসে ৩শ ১৭টি, এপ্রিলে ২শ ৮৮টি ও মে মাসে ৩শ ১০টি মামলা দায়ের হয়েছে।

২০২৫ সালের একই তিন মাসে ৯শ ৯৩টি মামলা হয়েছিল, তবে এর মধ্যে ২শ ২৬টি ছিল আগের ঘটনার জের। ফলে তুলনামূলক প্রকৃত সংখ্যাটি ছিল ৭শ ৬৭। অন্যদিকে ২০২৪ সালের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৭শ ৯৪।

চলতি বছর এই তিন মাসে সবচেয়ে বেশি ২শ ৭টি খুনের ঘটনা ঘটেছে ঢাকা রেঞ্জে। এরপর চট্টগ্রামে ১শ ৮৬টি, রাজশাহীতে ১শ ৬টি ও খুলনায় ৮৪টি মামলা হয়েছে। মেট্রোপলিটন এলাকাগুলোর মধ্যে বরাবরের মতোই শীর্ষে ঢাকা, যেখানে ৫৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

দিনদুপুরে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা এখন বড় প্রশ্নের মুখে। ঢাকার মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা খায়রুল হাসান বলেন, আমরা মোটেও নিরাপদ বোধ করছি না। খুন, গোলাগুলি আর ছিনতাই নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ নিরাপত্তা চায়, কিন্তু বারবার আশ্বাস দেওয়া হলেও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কোনো উন্নতি দেখা যাচ্ছে না।

সবশেষ গত শনিবার চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার এক জনাকীর্ণ বাজারে যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যা করা হয়। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, একটি অটোরিকশায় করে পাঁচ থেকে সাতজন সশস্ত্র ব্যক্তি এসে খুব কাছ থেকে তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায় এবং ফাঁকা গুলি ছুড়তে ছুড়তে পালিয়ে যায়। স্থানীয়রা এখন রাউজানকে ‘সন্ত্রাসের জনপদ’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে কেবল রাউজানেই অন্তত ২৫ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১৮টি মৃত্যুই রাজনৈতিক বিরোধের কারণে। একই সময়ে শতাধিক গোলাগুলি ও সংঘর্ষের ঘটনায় গুলিবিদ্ধসহ ৩শ ৫০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, নিহতদের অধিকাংশই বিএনপির নেতা-কর্মী। যদিও পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে সব নিহতের রাজনৈতিক পরিচয় নিশ্চিত করেনি।

অন্যান্য জেলাগুলোর মধ্যে গত শুক্রবার খুলনায় এক বিএনপি কর্মীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এছাড়া রোববার খুলনা শহরের দৌলতপুরে ফজর নামাজের সময় মসজিদের ভেতর সন্ত্রাসীরা গুলি চালালে দুই মুসল্লি আহত হন।

একই দিন ঢাকার পশ্চিম রামপুরায় শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন খান ওরফে ‘কাইল্যা পলাশ’ কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার মাত্র এক মাসের মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন।

গত ১ মে থেকে শুরু হওয়া বিশেষ অভিযানে দেশজুড়ে ১৮ হাজারেরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তবে তা অপরাধ দমনে যথেষ্ট ভূমিকা রাখছে না বলে মনে করেন অপরাধবিজ্ঞানীরা।

টাঙ্গাইলের মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধতত্ত্ব ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ওমর ফারুক সরকারের সমালোচনা করে বলেন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। এর পেছনে পুলিশ বাহিনীকে পুনর্গঠন না করাকে দায়ী করেন তিনি।

অধ্যাপক ফারুক উল্লেখ করেন, থানা থেকে লুট হওয়া এক হাজারেরও বেশি অস্ত্র এখনো উদ্ধার করা যায়নি। পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্র চোরাচালানও অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া ৫ আগস্টের পর মুক্তি পাওয়া অনেক অপরাধী রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থেকে এসব অস্ত্র ব্যবহার করে অপরাধ ঘটিয়ে যাচ্ছে।

ওমর ফারুকের ভাষায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নমনীয় অবস্থানের সুযোগ নিচ্ছে অপরাধীরা। তাদের ধারণা, অপরাধ করলেও সহজে পার পাওয়া যাবে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে অপরাধীদের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের উদ্যোগ রাজনৈতিক মতবিরোধের কারণে ভেস্তে গেছে। ফলে পুলিশের জবাবদিহিতা ও পেশাদারত্বের জায়গাটা উন্নত হয়নি। রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে প্রয়োজনীয় নীতিগত পদক্ষেপ না নেওয়ায় পরিস্থিতি ক্রমাগত খারাপের দিকে যাচ্ছে এবং অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হচ্ছে।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বেশ কয়েকজন কুখ্যাত গ্যাং লিডার ও দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধী কারাগার থেকে জামিনে বা বিদেশ থেকে দেশে ফিরে আসায় সহিংসতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। গোয়েন্দাদের ধারণা, এই অপরাধীরা তাদের হারানো সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধার ও পুরোনো শত্রুতার জের মেটাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।

মুক্ত বা ফিরে আসা শীর্ষ অপরাধীদের মধ্যে অন্যতম ‘কিলার আব্বাস’, সুইডেন আসলাম, ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে ‘পিচ্চি হেলাল’, সানজিদুল ইসলাম ইমন, খন্দকার নাঈম ওরফে ‘টিটন’, খোরশেদ আলম ওরফে ‘ফ্রিডম রাসু’, মোল্লা মাসুদ ও টোকাই সাগর।

২০০১ সালের ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় থাকা হাজারীবাগের ইমন ও মোহাম্মদপুরের পিচ্চি হেলালের মধ্যে দীর্ঘদিনের বৈরিতা রয়েছে। গত ২৮ এপ্রিল নিউ মার্কেটের কাছে ইমনের ভগ্নিপতি টিটনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তার পরিবার এ হত্যার জন্য হেলালকে দায়ী করলেও হেলাল পাল্টা অভিযোগ করেন, এর পেছনে ইমনের সহযোগীরাই জড়িত। এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।

এর আগে গত বছরের জানুয়ারিতে এলিফ্যান্ট রোডে চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে হেলালের ভাই ওয়াহেদুল হাসান দীপুর ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে ইমনের সহযোগীদের বিরুদ্ধে।

এছাড়া গত ১০ নভেম্বর ঢাকার আদালত পাড়ার কাছে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুনকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

গোয়েন্দাদের ধারণা, ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ইমনের সাথে বিরোধের জেরেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটে।

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে ৬৪টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৫ জন নিহত ও ২৮৯ জন আহত (১১ জন গুলিবিদ্ধ) হয়েছেন।

এপ্রিল মাসে ৯৮টি ঘটনায় ৬ জন নিহত ও ৫শ ৩৩ জন আহত (৩৭ জন গুলিবিদ্ধ) হয়েছেন। মার্চ মাসে ১শ ১৩টি ঘটনায় অন্তত ১৮ জন নিহত ও ৯শ ১২ জন আহত (১৫ জন গুলিবিদ্ধ) হয়েছেন।

সংগঠনটির মতে, এসব ঘটনার বড় অংশেই বিএনপির নেতা-কর্মীরা জড়িত ছিলেন বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

রাউজানে গত ২৬ এপ্রিল বিএনপি কর্মী নাসির উদ্দিন নিহত হন। এর দুদিন আগে ২৪ এপ্রিল নিহত হন বিএনপি নেতা কাউসারুজ্জামান। ২ এপ্রিল পাবনার ঈশ্বরদীতে ছাত্রদল নেতা ইমরান হোসেনকে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

খুলনায় ৫ মার্চ সাবেক রূপসা শ্রমিক দল সভাপতি মাসুম বিল্লাহ গুলিতে নিহত হন। আর ১৪ মার্চ বাগেরহাটে শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ সোহেলকে হত্যা করা হয়।

পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের জড়তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। প্রতিটি ঘটনার তদন্তে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি এবং ইতিবাচক ফলও পাওয়া যাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, অতীতে আন্ডারওয়ার্ল্ডের অপরাধীরা বিচারবহির্ভূত ব্যবস্থার ভয় পেত। বর্তমানে পুলিশ মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইন মেনে কাজ করছে।

রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে তিনি বলেন, দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল শুধু পুলিশের পক্ষে প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়।  এর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সামাজিক অনেক কারণ জড়িত। তবে অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন, তাদের ছাড় না দিতে সরকারের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে এবং পুলিশকে কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

দৈনিক আস্থা/এমএইচ

ট্যাগস :

দিনে ১০টি খুন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ

আপডেট সময় : ১২:২৪:৩৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬

দিনে ১০টি খুন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ

 

স্টাফ রিপোর্টার:

রাজনৈতিক কোন্দল, আন্ডারওয়ার্ল্ডের আধিপত্য বিস্তারের লড়াই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সংঘর্ষে দেশজুড়ে খুন, টার্গেট কিলিং বন্দুক হামলার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন মাসে সারা দেশে ৯শ ১৫টি হত্যাকাণ্ডের মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন ১০টিরও বেশি খুনের ঘটনা ঘটেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের বিস্তার, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দুর্বলতা এবং ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শীর্ষ অপরাধীদের মুক্তি ও দেশে ফিরে আসা সহিংসতা বাড়ার মূল কারণ। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল এখন রাজপথে এসে ঠেকেছে। ক্ষমতার লড়াইয়ে অপরাধী গোষ্ঠীগুলোকে ব্যবহার করা হচ্ছে, যার ফলে দেশজুড়ে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা ও হত্যাকাণ্ড ঘটছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মোট ৯শ ১৫টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণের ঠিক পরপরই, অর্থাৎ মার্চ মাসে ৩শ ১৭টি, এপ্রিলে ২শ ৮৮টি ও মে মাসে ৩শ ১০টি মামলা দায়ের হয়েছে।

২০২৫ সালের একই তিন মাসে ৯শ ৯৩টি মামলা হয়েছিল, তবে এর মধ্যে ২শ ২৬টি ছিল আগের ঘটনার জের। ফলে তুলনামূলক প্রকৃত সংখ্যাটি ছিল ৭শ ৬৭। অন্যদিকে ২০২৪ সালের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৭শ ৯৪।

চলতি বছর এই তিন মাসে সবচেয়ে বেশি ২শ ৭টি খুনের ঘটনা ঘটেছে ঢাকা রেঞ্জে। এরপর চট্টগ্রামে ১শ ৮৬টি, রাজশাহীতে ১শ ৬টি ও খুলনায় ৮৪টি মামলা হয়েছে। মেট্রোপলিটন এলাকাগুলোর মধ্যে বরাবরের মতোই শীর্ষে ঢাকা, যেখানে ৫৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

দিনদুপুরে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা এখন বড় প্রশ্নের মুখে। ঢাকার মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা খায়রুল হাসান বলেন, আমরা মোটেও নিরাপদ বোধ করছি না। খুন, গোলাগুলি আর ছিনতাই নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ নিরাপত্তা চায়, কিন্তু বারবার আশ্বাস দেওয়া হলেও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কোনো উন্নতি দেখা যাচ্ছে না।

সবশেষ গত শনিবার চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার এক জনাকীর্ণ বাজারে যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যা করা হয়। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, একটি অটোরিকশায় করে পাঁচ থেকে সাতজন সশস্ত্র ব্যক্তি এসে খুব কাছ থেকে তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায় এবং ফাঁকা গুলি ছুড়তে ছুড়তে পালিয়ে যায়। স্থানীয়রা এখন রাউজানকে ‘সন্ত্রাসের জনপদ’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে কেবল রাউজানেই অন্তত ২৫ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১৮টি মৃত্যুই রাজনৈতিক বিরোধের কারণে। একই সময়ে শতাধিক গোলাগুলি ও সংঘর্ষের ঘটনায় গুলিবিদ্ধসহ ৩শ ৫০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, নিহতদের অধিকাংশই বিএনপির নেতা-কর্মী। যদিও পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে সব নিহতের রাজনৈতিক পরিচয় নিশ্চিত করেনি।

অন্যান্য জেলাগুলোর মধ্যে গত শুক্রবার খুলনায় এক বিএনপি কর্মীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এছাড়া রোববার খুলনা শহরের দৌলতপুরে ফজর নামাজের সময় মসজিদের ভেতর সন্ত্রাসীরা গুলি চালালে দুই মুসল্লি আহত হন।

একই দিন ঢাকার পশ্চিম রামপুরায় শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন খান ওরফে ‘কাইল্যা পলাশ’ কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার মাত্র এক মাসের মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন।

গত ১ মে থেকে শুরু হওয়া বিশেষ অভিযানে দেশজুড়ে ১৮ হাজারেরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তবে তা অপরাধ দমনে যথেষ্ট ভূমিকা রাখছে না বলে মনে করেন অপরাধবিজ্ঞানীরা।

টাঙ্গাইলের মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধতত্ত্ব ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ওমর ফারুক সরকারের সমালোচনা করে বলেন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। এর পেছনে পুলিশ বাহিনীকে পুনর্গঠন না করাকে দায়ী করেন তিনি।

অধ্যাপক ফারুক উল্লেখ করেন, থানা থেকে লুট হওয়া এক হাজারেরও বেশি অস্ত্র এখনো উদ্ধার করা যায়নি। পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্র চোরাচালানও অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া ৫ আগস্টের পর মুক্তি পাওয়া অনেক অপরাধী রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থেকে এসব অস্ত্র ব্যবহার করে অপরাধ ঘটিয়ে যাচ্ছে।

ওমর ফারুকের ভাষায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নমনীয় অবস্থানের সুযোগ নিচ্ছে অপরাধীরা। তাদের ধারণা, অপরাধ করলেও সহজে পার পাওয়া যাবে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে অপরাধীদের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের উদ্যোগ রাজনৈতিক মতবিরোধের কারণে ভেস্তে গেছে। ফলে পুলিশের জবাবদিহিতা ও পেশাদারত্বের জায়গাটা উন্নত হয়নি। রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে প্রয়োজনীয় নীতিগত পদক্ষেপ না নেওয়ায় পরিস্থিতি ক্রমাগত খারাপের দিকে যাচ্ছে এবং অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হচ্ছে।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বেশ কয়েকজন কুখ্যাত গ্যাং লিডার ও দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধী কারাগার থেকে জামিনে বা বিদেশ থেকে দেশে ফিরে আসায় সহিংসতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। গোয়েন্দাদের ধারণা, এই অপরাধীরা তাদের হারানো সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধার ও পুরোনো শত্রুতার জের মেটাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।

মুক্ত বা ফিরে আসা শীর্ষ অপরাধীদের মধ্যে অন্যতম ‘কিলার আব্বাস’, সুইডেন আসলাম, ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে ‘পিচ্চি হেলাল’, সানজিদুল ইসলাম ইমন, খন্দকার নাঈম ওরফে ‘টিটন’, খোরশেদ আলম ওরফে ‘ফ্রিডম রাসু’, মোল্লা মাসুদ ও টোকাই সাগর।

২০০১ সালের ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় থাকা হাজারীবাগের ইমন ও মোহাম্মদপুরের পিচ্চি হেলালের মধ্যে দীর্ঘদিনের বৈরিতা রয়েছে। গত ২৮ এপ্রিল নিউ মার্কেটের কাছে ইমনের ভগ্নিপতি টিটনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তার পরিবার এ হত্যার জন্য হেলালকে দায়ী করলেও হেলাল পাল্টা অভিযোগ করেন, এর পেছনে ইমনের সহযোগীরাই জড়িত। এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।

এর আগে গত বছরের জানুয়ারিতে এলিফ্যান্ট রোডে চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে হেলালের ভাই ওয়াহেদুল হাসান দীপুর ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে ইমনের সহযোগীদের বিরুদ্ধে।

এছাড়া গত ১০ নভেম্বর ঢাকার আদালত পাড়ার কাছে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুনকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

গোয়েন্দাদের ধারণা, ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ইমনের সাথে বিরোধের জেরেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটে।

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে ৬৪টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৫ জন নিহত ও ২৮৯ জন আহত (১১ জন গুলিবিদ্ধ) হয়েছেন।

এপ্রিল মাসে ৯৮টি ঘটনায় ৬ জন নিহত ও ৫শ ৩৩ জন আহত (৩৭ জন গুলিবিদ্ধ) হয়েছেন। মার্চ মাসে ১শ ১৩টি ঘটনায় অন্তত ১৮ জন নিহত ও ৯শ ১২ জন আহত (১৫ জন গুলিবিদ্ধ) হয়েছেন।

সংগঠনটির মতে, এসব ঘটনার বড় অংশেই বিএনপির নেতা-কর্মীরা জড়িত ছিলেন বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

রাউজানে গত ২৬ এপ্রিল বিএনপি কর্মী নাসির উদ্দিন নিহত হন। এর দুদিন আগে ২৪ এপ্রিল নিহত হন বিএনপি নেতা কাউসারুজ্জামান। ২ এপ্রিল পাবনার ঈশ্বরদীতে ছাত্রদল নেতা ইমরান হোসেনকে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

খুলনায় ৫ মার্চ সাবেক রূপসা শ্রমিক দল সভাপতি মাসুম বিল্লাহ গুলিতে নিহত হন। আর ১৪ মার্চ বাগেরহাটে শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ সোহেলকে হত্যা করা হয়।

পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের জড়তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। প্রতিটি ঘটনার তদন্তে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি এবং ইতিবাচক ফলও পাওয়া যাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, অতীতে আন্ডারওয়ার্ল্ডের অপরাধীরা বিচারবহির্ভূত ব্যবস্থার ভয় পেত। বর্তমানে পুলিশ মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইন মেনে কাজ করছে।

রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে তিনি বলেন, দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল শুধু পুলিশের পক্ষে প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়।  এর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সামাজিক অনেক কারণ জড়িত। তবে অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন, তাদের ছাড় না দিতে সরকারের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে এবং পুলিশকে কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

দৈনিক আস্থা/এমএইচ