বাঁকা হাতে লিখে জিপিএ-৫; হতে চান ডাক্তার
- আপডেট সময় : ১১:৫২:৩০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬
- / ১০২৪ বার পড়া হয়েছে
বাঁকা হাতে লিখে জিপিএ-৫; হতে চান ডাক্তার
মোঃ হাবিব/ফুলবাড়িয়া প্রতিনিধিঃ
জন্ম থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধি ইয়াসার ইসলাম নীরব। দুটি পা ও হাত বিকলাঙ্গ হওয়ায় সোজা হয়ে ঠিকমতো বসতে পারেন না। মেরুদণ্ডের হাড়টাও তার বাঁকা। জন্মলগ্ন থেকে নিয়তিও সঙ্গ দেয়নি তাকে। জন্ম হয়েছে হতদরিদ্র এক পরিবারে। তবুও তার অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও আত্মবিশ্বাসের কাছে হার মেনেছে এসব প্রতিবন্ধকতা।
সকল প্রতিবন্ধকতা পেছনে ফেলে উপজেলার রাধাকানাই ইউনিয়নের পলাশতলী গ্রামের কৃষক সিরাজুল ইসলামের ছেলে
ইয়াসার ইসলাম নীরব এবার এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে অংশ নিয়ে পেয়েছে জিপিএ-৫।
কৃষক সিরাজুল ইসলামের ৩ সন্তান। তার মধ্যে ১ ছেলে ২ মেয়ে। ছেলে ইয়াসার ইসলাম নীরব সবার বড়, বোন ফারজানা ৭ম শ্রেণীতে সবার ছোট বোন সাদিকা আক্তার শিশু শ্রেণীতে লেখা পড়া করে।
ইয়াসার ইসলাম নীরব-এর ছেলের পড়ার আগ্রহ দেখে কৃষক বাবা সিরাজুল শিশু শ্রেণিতে ভর্তি করে কোলে করে স্কুলে পৌঁছে দিতেন। কিছুদিন পর স্কুল থেকে একটি হুইল চেয়ার দেওয়া হয়। পঞ্চম শ্রেনী পাশ করার পর পলাশতলী আমিরাবাদ উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেনীতে ভর্তি করানো হয়। বাড়ী থেকে বিদ্যালয় বেশ দূরে হওয়ায় পিতা সিরাজুল পৈত্রিক ভিটে ভাইয়ের কাছে বিক্রি করে বিদ্যালয়ের কাছে বাড়ী করেন।
ক্লাসে শতভাগ উপস্থিতির কারণে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দিয়েছেন পুরুষ্কার। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন ইয়াসার ইসলামের।
বুধবার (১২ আগস্ট) বিকালে নীরবের সাফল্যে তাকে অভিনন্দন ও উৎসাহ দিতে বাড়িতে গিয়ে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিনন্দন ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়। একই সঙ্গে তার চলাচলের সুবিধার্থে একটি হুইল চেয়ার প্রদান করেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) শেখ তাকি তাজওয়ার।
এ সময় সহকারী কমিশনার (ভূমি) শেখ তাকি তাজওয়ার নীরবের সার্বিক খোঁজখবর নেন এবং ভবিষ্যতেও তার পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। নিরবের স্বপ্নের কথা শুনে তিনি আরো বলেন, দারিদ্র্যতার কারণে তোমার শিক্ষা থেমে থাকবে না, প্রশাসন তোমার পাশে সব সময় থাকবে।
ইয়াসার ইসলাম নিরবের পিতা সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমার তিন সন্তান ওরাই আমার সব কিছু। আমি কামিল পাস করে চাকুরি পাই নাই, আমরা চার ভাই বাবা পৈত্রিক সম্পত্তি বলতে ভিটে মাটি ছাড়া আবাদি ২১ শতক জমি। পলাশতলী বাজারে শাড়ী লুঙ্গির ছোট একটি দোকান ছিলো করেনাকালীন সময়ে ব্যাবসায় লোকসান যায়। পরে ব্যবসা বাদদিয়ে মানুষের জমি বর্গা নিয়ে কৃষি কাজ করি। সুন্দর ভাবেই চলছি, সুখে শান্তিতে আছি। আমার ছেলের মেধার কারনে বাড়ী অনেকেই আসছে খোঁজ খবর নিচ্ছে অনেক ভালো লাগছে।
অদম্য মেধাবী ইয়াসার ইসলাম নিরব বলেন, পঞ্চম শ্রেনি পাশ করে ষষ্ঠ শ্রেনিতে ভর্তি হই আব্বু আমাকে স্কুলে নিয়ে যেতেন, মাঝে মধ্যে আমার সহপাঠীরাও বাড়ী থেকে স্কুলে নিয়ে যেতো এবং দিয়ে গেছে। আমার কখনো ওয়াশ রুমে যাওয়ার দরকার বন্ধুরা নিয়ে যেতো। তাদের অবদান আমি কোনদিন ভুলবো না। আমি উঠে বসতে পারতাম না, বিছানায় শুয়ে পড়া লেখা করতে পছন্দ করতাম।
নিরব আরও বলেন, পরীক্ষার আগে আব্বু আমাকে বলল, বসে বসে পড়ার চেষ্টা করো, এরপর আমি দুই মাস চেষ্টা করে সফল হই এবং এখন বসে লিখতে পারি, তবে শুয়ে লিখলে আমার স্পিরিট অনেক বেশি থাকে। আমি ডান হাতে লিখতে পারি না। আবার হাতের আঙুলগুলোও স্বাভাবিক না। মুষ্টিবদ্ধ অবস্থায় বাম হাতে লিখি। তবে আমি আশাবাদী ছিলাম আমি গোল্ডেন এ প্লাস পাবো। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছি। আমি কখনো প্রাইভেট পড়ি নাই।
নিরব বলেন, আগামীতে এইচএসসি শেষ করে মেডিকেলে চান্স নিতে চেষ্টা করবো। আমার কৃতিত্ব একজনকে দেওয়ার কোন সুযোগ নেই। আমার এ ফলাফল সকলের জন্য। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটাই চাওয়া, আমি যেন আমার লেখাপড়াটা চালিয়ে যেতে পারি, সেই ব্যবস্থাটা উনি করবেন। তাহলেই আমি আমার লক্ষে পৌঁছাতে পারবো।
পলাশতলী আমিরাবাদ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এ.কে.এম সায়ফুল ইসলাম কাজল বলেন, নিরবের বাবা, শিক্ষক, বন্ধু-বান্ধব সহ সকলেই অনেক আন্তরিক ছিলেন। এর ফলে আজকের অভাবনীয় ফল। আমার বিদ্যালয় তাকে নিয়ে গর্ব করে। ভবিষ্যতে ও অনেক ভালো করবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শহীদুল ইসলাম সোহাগ বলেন, নিরবের এ সাফল্য নি:সন্দেহে গর্বের। ভবিষ্যতের সফলতা অর্জনে কোন বাঁধাই থাকবে না। লিখিত আবেদন করলে সরকারি পৃষ্টপোষকতা ছাড়াও ব্যক্তিগতভাবে আমরা সহযোগিতা করবো, ইনশাল্লাহ।
দৈনিক আস্থা/এমএইচ



















