ঢাকা ০৪:৩৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬, ২৮ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বাড়তি সুবিধার ধারপ্রান্তে ইরান

Astha DESK
  • আপডেট সময় : ০৩:১৬:৪৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল ২০২৬
  • / ১০৫৭ বার পড়া হয়েছে

বাড়তি সুবিধার ধারপ্রান্তে ইরান

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অতি ভঙ্গুর দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘শতভাগ বিজয়’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তবে এই চুক্তি বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়েছে যে, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিকে ব্যবহার করে ইরান বিশ্ব অর্থনীতির ওপর কতটা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে সক্ষম হয়েছে। মূলত এই পানি পথটিকেই দরকষাকষির প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে তেহরান যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনার টেবিলে বাধ্য করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই পদক্ষেপ বিশ্ব অর্থনীতির নাড়ি চিপে ধরার মতো। হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার শর্তে যুদ্ধবিরতিতে রাজি হওয়া আসলে পরোক্ষভাবে তেহরানের প্রভাবকেই মেনে নেওয়া।

বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই অঞ্চলটিতে ইরানের সামরিক ও ভৌগোলিক আধিপত্য আন্তর্জাতিক বাজারকে আক্ষরিক অর্থেই জিম্মি করে ফেলেছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য এক বড় উদ্বেগ।

ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের জ্বালানি বিশেষজ্ঞ সামান্থা গ্রস মনে করেন, বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটাতে ইরানের বিশাল সামরিক শক্তির প্রয়োজন নেই। শুধুমাত্র এই একটি প্রণালি বন্ধ করে দিয়ে তারা যে প্রভাব সৃষ্টি করেছে, তা গত ছয় দশকে অকল্পনীয় ছিল।

বুধবার যুদ্ধবিরতির খবরে বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে, কিন্তু বিশ্লেষকরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা এখনো কাটেনি। বাজারের এই অস্থিরতা প্রমাণ করে যে তেহরানের একটি সিদ্ধান্ত পুরো বিশ্বের শিল্প ও পরিবহন খাতকে কতটা ওলটপালট করে দিতে পারে।

ক্যাপিটাল ইকোনমিক্সের প্রধান অর্থনীতিবিদ নিল শেয়ারিং সতর্ক করেছেন, যুদ্ধবিরতি হলেও স্থায়ী শান্তি এখনো অনেক দূর। তিনি মনে করেন, বাজারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হরমুজ প্রণালির বর্তমান অবস্থা। বুধবার সকালে কিছু তেলবাহী জাহাজ চলাচলের ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও ইসরায়েল লেবাননে আক্রমণ করার পর ইরান আবারও যান চলাচল সীমিত করার খবর পাওয়া গেছে।

এর অর্থ হলো, তেহরান এখনো এই পথটি নিজের মর্জিমতো নিয়ন্ত্রণ করছে এবং সামরিক শক্তি ব্যবহার করে জ্বালানি বাজারকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখছে।

গত ছয় সপ্তাহ ধরে ইরানের এই অবরোধের ফলে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে হাহাকার শুরু হয়েছে। বিশেষ করে এশিয়ায় জ্বালানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে, ফিলিপাইনের মতো দেশগুলোতে জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে হয়েছে।

অন্যদিকে ইউক্রেন যুদ্ধের রেশ কাটতে না কাটতেই ইউরোপে আবারও বিদ্যুতের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। এমনকি তেলসমৃদ্ধ খোদ যুক্তরাষ্ট্রেও সাধারণ মানুষকে জ্বালানি তেলের বর্ধিত মূল্য দিতে হচ্ছে, যা বাইডেন প্রশাসনের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

অক্সফোর্ড ইকোনমিক্সের ভূ-রাজনৈতিক কৌশলবিদ ড্যান আলামারিউ মনে করেন, ইরান এই প্রণালিকে সফলভাবে ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধে’ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে। তাদের শাসনব্যবস্থা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় কিছুটা দুর্বল হলেও এই সুযোগ ব্যবহারের মাধ্যমে তারা বিশ্বনেতাদের সাথে সমানে সমান লড়াই করার শক্তি অর্জন করেছে।

যুদ্ধের তহবিলের যোগান দিতে ইরান উচ্চমূল্যে তেল বিক্রি করার সুযোগও হাতছাড়া করেনি। ওয়াশিংটন বাধ্য হয়ে ইরানের প্রায় ১৪০ মিলিয়ন ব্যারেল তেলের ওপর থেকে সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে যাতে বিশ্ববাজারে সরবরাহের ঘাটতি মেটানো যায়।

কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের ডামাডোলে ইরান তাদের তেলের দাম উল্টো বাড়িয়েছে। সাধারণত আন্তর্জাতিক বাজারে ইরানি তেল কিছুটা ছাড়ে বিক্রি হলেও বর্তমানে চীন ও ভারতের বাজারে তা বিশ্ব বাজারের মূল্যের চেয়েও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।

প্রতিযোগিতার অভাব এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ থেকে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার সুযোগকে তেহরান পূর্ণভাবে কাজে লাগিয়েছে। এর ফলে তাদের যুদ্ধকালীন কোষাগার আগের চেয়েও সমৃদ্ধ হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

দৈনিক আস্থা/এমএই

ট্যাগস :

বাড়তি সুবিধার ধারপ্রান্তে ইরান

আপডেট সময় : ০৩:১৬:৪৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল ২০২৬

বাড়তি সুবিধার ধারপ্রান্তে ইরান

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অতি ভঙ্গুর দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘শতভাগ বিজয়’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তবে এই চুক্তি বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়েছে যে, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিকে ব্যবহার করে ইরান বিশ্ব অর্থনীতির ওপর কতটা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে সক্ষম হয়েছে। মূলত এই পানি পথটিকেই দরকষাকষির প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে তেহরান যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনার টেবিলে বাধ্য করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই পদক্ষেপ বিশ্ব অর্থনীতির নাড়ি চিপে ধরার মতো। হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার শর্তে যুদ্ধবিরতিতে রাজি হওয়া আসলে পরোক্ষভাবে তেহরানের প্রভাবকেই মেনে নেওয়া।

বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই অঞ্চলটিতে ইরানের সামরিক ও ভৌগোলিক আধিপত্য আন্তর্জাতিক বাজারকে আক্ষরিক অর্থেই জিম্মি করে ফেলেছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য এক বড় উদ্বেগ।

ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের জ্বালানি বিশেষজ্ঞ সামান্থা গ্রস মনে করেন, বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটাতে ইরানের বিশাল সামরিক শক্তির প্রয়োজন নেই। শুধুমাত্র এই একটি প্রণালি বন্ধ করে দিয়ে তারা যে প্রভাব সৃষ্টি করেছে, তা গত ছয় দশকে অকল্পনীয় ছিল।

বুধবার যুদ্ধবিরতির খবরে বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে, কিন্তু বিশ্লেষকরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা এখনো কাটেনি। বাজারের এই অস্থিরতা প্রমাণ করে যে তেহরানের একটি সিদ্ধান্ত পুরো বিশ্বের শিল্প ও পরিবহন খাতকে কতটা ওলটপালট করে দিতে পারে।

ক্যাপিটাল ইকোনমিক্সের প্রধান অর্থনীতিবিদ নিল শেয়ারিং সতর্ক করেছেন, যুদ্ধবিরতি হলেও স্থায়ী শান্তি এখনো অনেক দূর। তিনি মনে করেন, বাজারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হরমুজ প্রণালির বর্তমান অবস্থা। বুধবার সকালে কিছু তেলবাহী জাহাজ চলাচলের ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও ইসরায়েল লেবাননে আক্রমণ করার পর ইরান আবারও যান চলাচল সীমিত করার খবর পাওয়া গেছে।

এর অর্থ হলো, তেহরান এখনো এই পথটি নিজের মর্জিমতো নিয়ন্ত্রণ করছে এবং সামরিক শক্তি ব্যবহার করে জ্বালানি বাজারকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখছে।

গত ছয় সপ্তাহ ধরে ইরানের এই অবরোধের ফলে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে হাহাকার শুরু হয়েছে। বিশেষ করে এশিয়ায় জ্বালানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে, ফিলিপাইনের মতো দেশগুলোতে জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে হয়েছে।

অন্যদিকে ইউক্রেন যুদ্ধের রেশ কাটতে না কাটতেই ইউরোপে আবারও বিদ্যুতের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। এমনকি তেলসমৃদ্ধ খোদ যুক্তরাষ্ট্রেও সাধারণ মানুষকে জ্বালানি তেলের বর্ধিত মূল্য দিতে হচ্ছে, যা বাইডেন প্রশাসনের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

অক্সফোর্ড ইকোনমিক্সের ভূ-রাজনৈতিক কৌশলবিদ ড্যান আলামারিউ মনে করেন, ইরান এই প্রণালিকে সফলভাবে ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধে’ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে। তাদের শাসনব্যবস্থা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় কিছুটা দুর্বল হলেও এই সুযোগ ব্যবহারের মাধ্যমে তারা বিশ্বনেতাদের সাথে সমানে সমান লড়াই করার শক্তি অর্জন করেছে।

যুদ্ধের তহবিলের যোগান দিতে ইরান উচ্চমূল্যে তেল বিক্রি করার সুযোগও হাতছাড়া করেনি। ওয়াশিংটন বাধ্য হয়ে ইরানের প্রায় ১৪০ মিলিয়ন ব্যারেল তেলের ওপর থেকে সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে যাতে বিশ্ববাজারে সরবরাহের ঘাটতি মেটানো যায়।

কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের ডামাডোলে ইরান তাদের তেলের দাম উল্টো বাড়িয়েছে। সাধারণত আন্তর্জাতিক বাজারে ইরানি তেল কিছুটা ছাড়ে বিক্রি হলেও বর্তমানে চীন ও ভারতের বাজারে তা বিশ্ব বাজারের মূল্যের চেয়েও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।

প্রতিযোগিতার অভাব এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ থেকে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার সুযোগকে তেহরান পূর্ণভাবে কাজে লাগিয়েছে। এর ফলে তাদের যুদ্ধকালীন কোষাগার আগের চেয়েও সমৃদ্ধ হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

দৈনিক আস্থা/এমএই