অনিয়ম-অপরাধে জড়িত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হার্ডলাইনে বিএনপি
- আপডেট সময় : ০৯:৪৪:০২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬
- / ১০২২ বার পড়া হয়েছে
অনিয়ম-অপরাধে জড়িত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হার্ডলাইনে বিএনপি
মোফাজ্জল হোসেন ইলিয়াছঃ
ক্ষমতার সঙ্গে পদ-পদবির দাপট দেখিয়ে অনিয়ম-অপরাধে জড়ালে কোনো ছাড় নয়—এমন কঠোর বার্তা দিতে চাইছে ক্ষমতাসীন বিএনপি। দলের এমপি, মন্ত্রী কিংবা শীর্ষ পর্যায়ের নেতা হলেও অভিযোগের প্রমাণ মিললে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে; প্রয়োজন হলে করা হবে মামলা, নিশ্চিত করা হবে আইনি শাস্তিও।
রাড্ডাকাণ্ডে সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ এবং ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপিসহ একাধিক কমিটি বিলুপ্তির মধ্য দিয়ে সেই বার্তাই দেওয়া হচ্ছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
বিশেষ করে মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ সামনে আসার পর দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে।
সরকারের পাশাপাশি দলকেও সব ধরনের বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখতে চান প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সরকার গঠনের পর বেশ কিছু ঘটনা, বিশেষ করে সম্প্রতি মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি হাসপাতালকাণ্ডে ক্ষমতাসীন বিএনপিকে ব্যাপক পরিসরে সমালোচনার কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হচ্ছিল।
দলের ভেতরে যারা অনিয়ম, অপকর্ম, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড কিংবা চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত— তাদের বিরুদ্ধে অ্যাকশনে নেমেছে বিএনপি। দলটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এ ব্যাপারে তারা সম্পূর্ণ ‘জিরো টলারেন্স’নীতি গ্রহণ করবে। যেখানেই নেতাকর্মীরা এ ধরনের কাজে সম্পৃক্ত হবে, তাকে বা তাদের দল থেকে বহিষ্কার করা হবে।
শুধু সাংগঠনিক ব্যবস্থাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না— প্রয়োজনে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থাও নেওয়া হবে। সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে সরকার যে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে, সেটি থেকে উত্তরণে সরকার ও ক্ষমতাসীন বিএনপি-সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
গত ২৫ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দুই শতাধিক ব্যক্তি হামলা চালায়। নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ঢুকে ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জামসহ বিভিন্ন সামগ্রী লুট করা হয়। পরে ভারী যন্ত্র দিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের একটি স্থায়ী ও তিনটি আধাপাকা স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। প্রায় পাঁচ দশক ধরে প্রতিষ্ঠানটি দরিদ্র মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছিল।
এরপর এ ঘটনায় জড়িত থাকার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ায় মহানগর উত্তরের কয়েকটি সংগঠন এবং বেশ কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয় দল। রাড্ডা সেন্টারে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় স্থানীয় বিএনপির কয়েকজনের সম্পৃক্ততার অভিযোগও প্রকাশ্যে এসেছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের মধ্য দিয়ে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে বিএনপি। সরকার গঠনের পর থেকে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখাই ছিল ক্ষমতাসীন দলটির প্রধান চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার নানান ধরনের পদক্ষেপ নিয়ে আসছে; চলছে পুলিশি অভিযান। শৃঙ্খলা ফেরাতে চাকরিচ্যুতিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনেকের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিয়েছে সরকার।
কিন্তু তারপরও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো পূর্ণমাত্রায় স্বাভাবিক হয়নি। এটি নিয়ে সরকারের ভেতরেও দুশ্চিন্তা রয়েছে। এর পাশাপাশি দলের নেতাকর্মীরাও বিভিন্ন জায়গায় সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছে, ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে যুক্ত হচ্ছে নানান অপকর্মে— কেন্দ্রীয় বিএনপির কাছে এমন তথ্য আছে।
দল এ ব্যাপারে এত দিন বিচ্ছিন্নভাবে ব্যবস্থা নিলেও বড় ধরনের পদক্ষেপ এসেছে গত বুধবার ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির কমিটি ভেঙে দেওয়ার মধ্য দিয়ে। কারণ, কমিটির অনেকের বিরুদ্ধে নানান ধরনের অনিয়ম-অপকর্মে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় এলাকায় বিভিন্ন গার্মেন্ট নিয়ন্ত্রণ, টেন্ডারবাজির পাশাপাশি সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে তারা ব্যাপক দাপট দেখাচ্ছেন বলে কেন্দ্রের কাছে তথ্য ছিল। উত্তর বিএনপি ছাড়াও একই দিন ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদল ও ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটিও বিলুপ্ত করা হয়।
এ ছাড়া দল ও অঙ্গ-সংগঠনের ডজনের বেশি নেতাকে করা হয় বহিষ্কার। ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্তির বিষয়টি বিএনপির পক্ষ থেকেও নিশ্চিত করা হয়েছে। রাড্ডা হাসপাতালকাণ্ডের নেপথ্যকারী হিসেবে শুরু থেকেই ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সদ্য বিলুপ্ত কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক এবং দলের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির দিকে অভিযোগের তীর ছিল।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গতকাল জানিয়েছেন, পুলিশের তদন্তে মিষ্টির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযোগপত্র দেওয়া হবে এবং সে অনুযায়ী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী ও বিএনপি নেতা রাশেদ খান বলেছেন, ‘বিএনপি যেকোনো অপরাধীকে প্রশ্রয় দেয় না এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে— এটি আবারও প্রমাণিত হলো।’
‘অপরাধ-সন্ত্রাস দমনে বা দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের যে অঙ্গীকার— রাড্ডার ঘটনায় গৃহীত পদক্ষেপে সেটিরই প্রতিফলন ঘটেছে। কোনো ঘটনায় বিএনপি দলগতভাবে কোনোভাবেই জড়িত নয়। তবে দলের কেউ জড়িত থাকলে, তার কোনো ছাড় নেই। তার বা তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আইনগত ব্যবস্থাও দেশবাসী দেখতে পাবে’— যোগ করেন তিনি।
আস্থা/এমএইচ











