ঢাকা ১২:০১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিচারাধীন বিষয়ে “নেত্র নিউজ” এর প্রতিবেদনে বিজিবির প্রতিবাদ

Astha DESK
  • আপডেট সময় : ১১:১৯:১৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬
  • / ১০১৫ বার পড়া হয়েছে

বিচারাধীন বিষয়ে “নেত্র নিউজ” এর প্রতিবেদনে বিজিবির প্রতিবাদ

মোফাজ্জল হোসেন ইলিয়াছ/মানিক পাটোয়ারীঃ

গতকাল সুইডেন ভিত্তিক অনলাইন সংবাদ মাধ্যম “নেত্র নিউজ” এর সোশ্যাল প্লাটফর্মে ‘(জুলাই অনুসন্ধান) জেনারেলের দায়মুক্তি’ শিরোনামে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলি নিয়ে প্রচারিত একটি দীর্ঘ প্রতিবেদনে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং বিজিবির ২৫তম মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে গুরুতর ও স্পর্শকাতর বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে। এই অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর খবরের তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়ে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদর দপ্তর থেকে বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা মোঃ শরীফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে সংবাদ মাধ্যমে প্রেরণ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বিজিবির গুলিতে ৮৬ জন নিহত হওয়ার দাবি, বিভিন্ন স্থানে বিজিবির নির্বিচার গুলিবর্ষণ, ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ এবং বিজিবির মহাপরিচালকের ভূমিকা সম্পর্কে এমনভাবে বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন এসব অভিযোগ ইতোমধ্যে বিচারিকভাবে প্রতিষ্ঠিত সত্য। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ উক্ত প্রতিবেদনের একপাক্ষিক, অনুমাননির্ভর, অতিরঞ্জিত ও বিভ্রান্তিকর উপস্থাপনার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছে।

প্রথমত, বিষয়টি বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন। বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগে কোনো অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা কিংবা কোনো ব্যক্তি বিশেষের কথিত কর্মকাণ্ডের দায় সম্পূর্ণ বাহিনী বা তার নেতৃত্বের ওপর আরোপ করা কোনোভাবেই সমীচীন নয়। বিচারাধীন বিষয়ে অভিযোগ, অনুসন্ধানের দাবি এবং আদালতে আইনগতভাবে প্রমাণিত সত্য—এই তিনটির মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য থাকা অপরিহার্য।

প্রতিবেদনটিতে বারবার “প্রমাণ”, “নিশ্চিত”, “হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণ”, “হত্যাযজ্ঞ” ইত্যাদি সিদ্ধান্তমূলক শব্দ ব্যবহার করে এমন একটি বয়ান তৈরি করা হয়েছে, যা পাঠক-দর্শকের কাছে বিচারিক সিদ্ধান্তের পূর্বেই একটি নির্দিষ্ট রায় প্রতিষ্ঠার প্রয়াস বলে প্রতীয়মান হয়। বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে সত্য ও তথ্য উদঘাটনের নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের চেয়ে ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক আক্রোশ ও আক্রমণের প্রবণতাই অধিকতর স্পষ্ট, যা সাংবাদিকতার বস্তুনিষ্ঠতা ও স্বীকৃত নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

দ্বিতীয়ত, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বিজিবির গুলিতে ৮৬ জন মৃত্যুর যে সংখ্যা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তা বাস্তবতা বিবর্জিত এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রতীয়মান। কোনো এলাকায় বিজিবি মোতায়েন ছিল—এ তথ্যকে ওই এলাকায় সংঘটিত প্রতিটি মৃত্যুর সঙ্গে সরাসরি বিজিবির গুলির সম্পর্ক হিসেবে উপস্থাপন করা তথ্য অনুসন্ধানের গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি হতে পারে না। কোনো মৃত্যুর জন্য দায় নির্ধারণ করতে হলে ঘটনাস্থলের আলামত, অস্ত্রের ব্যবহার, ব্যালিস্টিক ও ফরেনসিক পরীক্ষা, সংশ্লিষ্ট সদস্যদের অবস্থান, ডিউটি রেকর্ড এবং অন্যান্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রমাণের সমন্বিত বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, প্রতিবেদনে নরসিংদীর ড্রিম হলিডে পার্কে বিজিবির অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন এবং মাইক্রোবাস ও পিকআপের স্লাইডিং ডোর খোলা রেখে বিজিবি সদস্যদের টহল ও নির্বিচারে গুলিবর্ষণের যে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তা সম্পূর্ণ অসত্য ও বাস্তবতাবিবর্জিত। উক্ত সময়ে ড্রিম হলিডে পার্কে বিজিবির কোনো ক্যাম্পই ছিল না। ফলে সেখানে বিজিবির ক্যাম্প থেকে কথিতভাবে টহল পরিচালনা বা নির্বিচারে গুলিবর্ষণের প্রশ্নই ওঠে না। প্রতিবেদনে এমন একটি ঘটনাকে অত্যন্ত ফিল্মি ভাষায় উপস্থাপন করা হয়েছে, যার ভিত্তিই বাস্তব নয়।

চতুর্থত, সিলেটের গোলাপগঞ্জের ঘটনা নিয়েও প্রতিবেদনে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সময়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশে কয়েক রাউন্ড ফাঁকা ফায়ার করা হয়েছিল। পরবর্তীতে দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট নিজেই স্টেটমেন্ট দিয়ে জানিয়েছেন যে ওই ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি। অথচ এই ঘটনার সঙ্গে হতাহতের অভিযোগকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যাতে বিজিবির বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী গুলিবর্ষণের একটি পূর্বনির্ধারিত বয়ান প্রতিষ্ঠিত হয়। দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের প্রত্যক্ষ বক্তব্য ও প্রশাসনিক নথি যথাযথভাবে যাচাই না করে এ ধরনের উপস্থাপন নিঃসন্দেহে প্রশ্নবিদ্ধ।

পঞ্চমত, প্রতিবেদনে বিজিবির মহাপরিচালকের একটি বক্তব্যকে পরবর্তী হতাহতের ঘটনার সঙ্গে সরাসরি কার্যকারণ সম্পর্কযুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। কোনো সরকারি স্থাপনা রক্ষা, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ কিংবা দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময়ের বক্তব্যকে পরবর্তী প্রতিটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার “উসকানি” হিসেবে চিহ্নিত করতে হলে প্রত্যক্ষ ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন। শুধু বক্তব্যের আগে-পরে ঘটনাপ্রবাহ সাজিয়ে একটি অপরাধমূলক কার্যকারণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা সাংবাদিকতার বস্তুনিষ্ঠ অনুসন্ধানের বিকল্প হতে পারে না।

ষষ্ঠত, একজন বাহিনীপ্রধানের অধীনস্থ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলার ছবি বা ভিডিওকে পরবর্তীতে সংঘটিত কোনো ঘটনার বেআইনি নির্দেশের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। দায়িত্বপ্রাপ্ত ইউনিটের কমান্ডারের সঙ্গে বাহিনীপ্রধানের মতবিনিময় দায়িত্ব পালনের স্বাভাবিক অংশ। কোনো কর্মকর্তা কোনো ঘটনায় অভিযুক্ত হলে তার বিরুদ্ধে পৃথকভাবে তার নিজস্ব কার্যক্রম, আদেশ, যোগাযোগ এবং প্রমাণ যাচাই করতে হবে। সাংগঠনিক সম্পর্ককে সরাসরি অপরাধের প্রমাণ হিসেবে দেখানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

বিজিবি মহাপরিচালক প্রায় ৬০ হাজার সদস্যের একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীর সর্বোচ্চ কমান্ডার—কোনো নির্দিষ্ট এক-দুইজন কর্মকর্তা বা ইউনিটের কমান্ডার নন।

অতএব, কতিপয় সদস্যকে পৃথকভাবে গুলির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, অথচ একই সময়ে দায়িত্বে থাকা অন্য সদস্যরা সেই নির্দেশের আওতার বাইরে ছিলেন—এমন দাবি সুস্পষ্ট ও যাচাইযোগ্য প্রমাণ ছাড়া গ্রহণযোগ্য নয়। কোনো বক্তব্য, ছবি বা বিচ্ছিন্ন ঘটনার ভিত্তিতে মহাপরিচালকের সরাসরি নির্দেশ বা কমান্ড দায় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা বাস্তব কমান্ড কাঠামো ও দায়িত্ব বণ্টনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

সপ্তমত, প্রতিবেদনে নিহতদের স্বজন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে—যা অনুসন্ধানের একটি উপাদান হতে পারে। কিন্তু কোনো প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্যকে ব্যালিস্টিক, ফরেনসিক, চিকিৎসা, ময়নাতদন্ত, ঘটনাস্থলের আলামত এবং সংশ্লিষ্ট বাহিনীর ডিউটি রেকর্ড দিয়ে যাচাই না করে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না। বিশেষ করে কোন অস্ত্র থেকে কোন গুলি ছোড়া হয়েছে—এটি কেবল অনুমান বা দৃশ্যমান অস্ত্রের ধরন দেখে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

অষ্টমত, প্রতিবেদনে বিজিবিকে “হত্যাযজ্ঞে অংশগ্রহণকারী” এবং “নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের নির্মমভাবে দমনকারী” হিসেবে সামগ্রিকভাবে চিত্রিত করা হয়েছে। এ ধরনের ভাষা একটি সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের সিদ্ধান্ত প্রচারের শামিল। কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অপরাধের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তার তদন্ত ও বিচার আইনানুগ প্রক্রিয়ায় হতে পারে; কিন্তু ব্যক্তির সম্ভাব্য দায়কে পুরো বাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক দায় হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা ন্যায়সংগত নয়। এছাড়াও পুলিশ ও বিজিবি ব্যতীত অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের কর্তৃক বিভিন্ন স্থানে গুলি করা হলেও শুধুমাত্র বিজিবিকে মোটামুটি এককভাবে এবং পুলিশ বাহিনীকে কিছুটা উক্ত প্রতিবেদনে দায়ী করা হচ্ছে।

বিজিবি আরও উল্লেখ করতে চায়, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্তের নিরাপত্তা রক্ষায় বিজিবি অত্যন্ত দৃঢ়তা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে। সীমান্ত হত্যা রোধ, সীমান্তবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রতিবেশী দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত অপতৎপরতা মোকাবিলা এবং জোরপূর্বক পুশ-ইন প্রতিরোধে বিজিবি সীমান্তবাসীকে সঙ্গে নিয়ে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। এমন একটি সময়ে আদালতে বিচারাধীন একটি বিষয়কে নাটকীয় ও একপাক্ষিকভাবে উপস্থাপন করা বাহিনীর সদস্যদের মনোবল ক্ষুণ্ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা দুর্বল করার অপপ্রয়াস বলেই প্রতীয়মান হয়।

বিজিবি স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। একই সঙ্গে প্রত্যাশা করে, আদালতে বিচারাধীন কোনো বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য, প্রাসঙ্গিক নথি, প্রত্যক্ষ প্রমাণ এবং আইনগত অবস্থান যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া উচিৎ। বিচারাধীন বিষয়ে আগাম কোনো সিদ্ধান্ত বা একপাক্ষিক ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে বস্তুনিষ্ঠ, ভারসাম্যপূর্ণ ও তথ্যনির্ভর সংবাদ পরিবেশনই জনস্বার্থে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ।

বিজিবি কোনো সদস্যের বেআইনি কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় দেয় না এবং কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ক্ষেত্রে আইনানুগ তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল। একইভাবে, বিজিবির বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে তা যথাযথ প্রমাণসহ উপস্থাপন করা হোক—গণমাধ্যমের পর্দায় আগাম রায় হিসেবে নয়।

বিজিবি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, সত্য উদঘাটনের দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা এবং বিচারাধীন বিষয়ে আগাম রায় প্রচারের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। নেত্র নিউজের উক্ত প্রতিবেদনে এই সীমারেখা একাধিক ক্ষেত্রে অতিক্রম করা হয়েছে। ফলে প্রতিবেদনে বিজিবি ও এর মহাপরিচালক সম্পর্কে উপস্থাপিত একপাক্ষিক, অতিরঞ্জিত ও তথ্যগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ বক্তব্যের বিরুদ্ধে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানাচ্ছে। একই সঙ্গে সীমান্তের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় নিয়োজিত একটি রাষ্ট্রীয় বাহিনীর দায়িত্ব, মনোবল ও প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতার বিষয়টি দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার স্বার্থেই বিবেচনায় নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানানো হচ্ছে।

জুলাই গণঅভ্যূত্থানে রামপুরার ঘটনা নিয়ে The Daily Star পত্রিকায় উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে বিজিবি’র মতামত:

রাজধানীর রামপুরায় গত ১৯ জুলাই ২০২৪-এর সহিংসতার ঘটনায় বিজিবিকে এককভাবে দায়ী করে একটি উদ্দেশ্য প্রণোদিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। Daily Star এর মতন একটি মূলধারার পত্রিকার মাল্টিমিডিয়ায় আংশিক সত্য নিয়ে এমন মনগড়া, ভিউ প্রত্যাশী একটি প্রতিবেদন আমাদের বিষ্মিত করেছে। টেক গ্লোবাল ইন্সটিটিউটের ফরেনসিক গবেষণার বরাত দিয়ে ”রামপুরা হত্যাকাণ্ড: বিজিবি কি দায়ী? ভিডিও বিশ্লেষণ যা বলছে” এবং “Anatomy of BGB Shootings in Rampura”- শীর্ষক প্রতিবেদনে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (BGB)-কে একতরফাভাবে দোষারোপ করা হয়েছে।

বর্তমানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তত্ত্বাবধানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও অন্যান্য তদন্তকারী সংস্থার অধীনে গণঅভ্যুত্থান সময়কালীন বিভিন্ন হত্যা মামলার বিচার কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে চলমান রয়েছে। উক্ত বিচারকার্য সম্পন্ন করার জন্য বিজিবিও সম্পূর্ণভাবে সহযোগিতা প্রদানের জন্য প্রস্তুত। এমন এক সময়ে কিছু তদন্তনাধীন ও বিচারাধীন বিষয়কে নাটকীয়ভাবে আনা হলো যখন প্রত্যন্ত গ্রামবাসীকে সাথে নিয়ে বিজিবি সীমান্তে মাথা উঁচু করা নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছে। আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের প্রতিবাদ বা সাম্প্রতিক পুশ ইন প্রতিরোধে অসামান্য অবদান রাখার পর বাহিনীর মনোবল ভাঙতে আংশিক সত্য নিয়ে এই একপেশে রিপোর্টটি করা হয়েছে বলে প্রতীয়মান।

গত ১৯ জুলাই ২০২৪ এ রামপুরায় ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এর পাশাপাশি র‌্যাব, আনসার ও বিজিবি সদস্যরা উপস্থিত থাকলেও শুধুমাত্র বিজিবি’কে এককভাবে দায়ী করার বিষয়টি উক্ত প্রতিবেদনের পক্ষপাতিত্বকে সুষ্পষ্টভাবে প্রতীয়মান করেছে। আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতায় পরিচালিত তথাকথিত এই যৌথ অনুসন্ধান মূলত নির্বাচিত ফুটেজ ও অনুমাননির্ভর বর্ণনায় গড়ে উঠেছে, যার প্রধান অসংগতি সমূহ তুলে ধরা হলোঃ

বিজিবি সদস্যের ফায়ারিং এ গুলিবিদ্ধ হওয়া প্রসংগে:
প্রতিবেদনের শুরুতে কমলা রং এর টি শার্ট পরিহিত যুবক রমজান এর গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে যাওয়ার দৃশ্য প্রদর্শিত হয়। ভিডিওর ৩১ সেকেন্ডে প্রদর্শিত ফুটেজটি নিঃসন্দেহে কোন বহুতল ভবন এর উপর থেকে রেকর্ডকৃত। কে বা কারা যুবক রমজানের দিকে অস্ত্র তাক করেছিল তার সুনির্দিষ্ট তথ্য/প্রমান ভিডিওটিতে অনুপস্থিত। এছাড়াও রমজানের চতুর্পার্শ্বে আরো অন্যান্য ব্যক্তিবর্গ থাকায় আপাতভাবে মনে হচ্ছে তাকে কোন ছাদ থেকে অথবা উঁচু কোন স্থান থেকে গুলি করা হয়েছে, তা না হলে তার গায়ে না লেগে তার চতুর্পাশ্বে যারা রয়েছে, তাদের কারো গায়ে লাগার কথা। জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করার মানসে বিজিবি’র দিকে আঙ্গুলী প্রদর্শনপূর্বক ফুটেজটির অবতারনা করা হয়েছে। এছাড়াও ভিডিওর ১ মিনিট ১০ সেকেন্ড হতে ০১ মিনিট ২০ সেকেন্ড পর্যন্ত দেখানো হয়েছে অন্য একটি বাহিনীর ফায়ারিং এর দৃশ্য। Tech Global Institute এর ২০০ ছবি ও ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষনে ঐ বাহিনীর সদস্যদের ফায়ারিং এর চিত্র দৃশ্যায়িত হলেও অজানা কোন এক কারণে বাহিনীটির নাম উচ্চারিত হয়নি।

ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতি নিয়ে অপতথ্য:
১৬ জুলাই হতে ০৫ আগস্ট পর্যন্ত সমগ্র দেশে পূর্ববর্তী সরকারের আদেশে BGB মোতায়েন করতে হয়েছিল দণ্ডবিধি ১৮৯৮-এর ১২৮-১৩২ ধারা ও ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফ্‌লস রেগুলেশন ১৯২২-এর ৩১০, ৩১০-এ অনুযায়ী। প্রতিবেদনে ম্যাজিস্ট্রেট অনুপস্থিত থাকার দাবি করা হয়েছে, অথচ সরকারি নথিতে উক্ত তারিখে দায়িত্বরত ম্যাজিস্ট্রেটদের পূর্ণ তালিকা বিদ্যমান ও আদালতে উপস্থাপিত। ফুটেজে ম্যাজিস্ট্রেটকে দেখা যায়নি মানে এই নয় যে তিনি/তারা সেখানে ছিলেন না।

গুলির পরিমাণ নিয়ে বিভ্রান্তি:
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, বিজিবি কর্তৃক ৯৭২ রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়েছে। তবে এর মধ্যে যে বিজিবি’র ধ্বংসপ্রাপ্ত/পুড়ে যাওয়া জীপ এর অভ্যন্তরে থাকা ৬০০ রাউন্ড এর বেশি গোলাবারুদ ছিল, তা উল্লেখ করা হয়নি। অর্থাৎ উল্লেখিত গুলির মধ্যে অধিকাংশই পুড়ে যাওয়া গাড়ীর অভ্যন্তরে রাখা ধ্বংসপ্রাপ্ত গুলি এবং উর্ধ্বমুখে ছোড়া অধিকাংশ ফাঁকা গুলি ছিল।

শক্তি প্রয়োগ সংক্রান্ত অন্যান্য কিছু বিষয়:
BGB-র কোনও ‘র‍্যাপিড অ্যাকশান টিম মাঠে নামেনি, LMG কিংবা কোন ভারী অস্ত্র গাড়ির ছাদে বসানো হয়নি, কোথাও বালুর ব্যারিকেডও গড়ে তোলা হয়নি, আন্দোলনের বিরুদ্ধে কোন হেলিকপ্টার ব্যবহার করেনি। যখন গণগ্রেফতারের আদেশ হয়েছিল তখনও বিজিবির কোন টহল একজন ব্যক্তিকেও গ্রেফতার করেনি। ৫ ই আগস্ট পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত বিজিবির কোন স্থাপনায় কোন বিতর্কিত ব্যক্তিবর্গকে আশ্রয় গ্রহণ করতে দেওয়া হয়নি।

বিনা উস্কানিতে গুলি তত্ত্ব ভিত্তিহীন:
ভিডিও বিশ্লেষন বলছে-৫ মিনিটের ব্যবধানে ইট-বাঁশ-পেট্রলবোমা নিক্ষিপ্ত হওয়ার পরই বিজিবি সতর্ক-ফায়ার দেয়। পুলিশের ব্যর্থতায় স্থানীয় প্রশাসন জরুরি ভিত্তিতে বিজিবি’র সহায়তা চায়, যা প্রতিবেদক নিজের ভাষ্যেই স্বীকার করেছেন। অথচ পূর্ণ প্রেক্ষিত বাদ দিয়ে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ক্লিপ তুলে ধরে “বিনা উস্কানিতে গুলি’’ শীর্ষক উপসংহারে উপনীত হওয়া নিতান্তই সাংঘর্ষিক।

জন-সমর্থনের চিত্র:
আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর স্থাপনা সমূহ আন্দোলনকারীদের দ্বারা আক্রান্ত হলেও সারা দেশে বিজিবি’র সকল ক্যাম্প সমূহ অক্ষত ছিল। রামপুরা, বাড্ডা, গুলশানসহ বহু এলাকায় টেলিভিশন ফুটেজে দেখা যায় ছাত্র-জনতা বিজিবি’র টহলকে আক্রান্ত করেনি, বরঞ্চ অনেক স্থানে একই সাথে বিজিবি ও ছাত্র জনতাকে সহমতে সংহতি প্রকাশ করতে দেখা গিয়েছে। বিজিবির দুই একজন সদস্য যাকে/যাদেরকে প্রচলিত নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে বল প্রয়োগ করতে দেখা গেছে, তার/তাদের কারণে একটি বাহিনীকে সামগ্রিকভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘণকারী বলতে হলে দৃঢ়, যাচাইকৃত প্রমাণ দরকার, যেটি রিপোর্টে পূর্ণাঙ্গভাবে অনুপস্থিত। এছাড়াও উল্লেখ্য যে, এক্ষেত্রে বিজিবি কর্তৃক দ্রুততার সাথে ঘটনার দুই মাসের মধ্যেই প্রাথমিক তদন্ত সম্পন্ন করা হয়েছে।

এডিটকৃত গুলির শব্দ সংযোজন:
প্রতিবেদনের ১৪:২৪ মিনিটে ০৩ জন বিজিবি সদস্যকে দাড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তবে এডিটকৃত গুলির শব্দ সংযোজন করে এখানে একটি নাটকীয় সাউন্ড ইফেক্ট আনার অপচেষ্টা করা হয়েছে, যার মাধ্যমে বিজিবি’র সদস্যরা অনেক পরিমাণ গুলি করছেন মর্মে ভুল দৃশ্য উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে।

প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন:
এমন এক সময়ে কিছু তদন্তাধীন বিষয়কে নাটকীয়ভাবে উপস্থাপন করা হলো যখন প্রত্যন্ত গ্রামবাসীকে সাথে নিয়ে বিজিবি সীমান্তে মাথা উঁচু করা নতুন বাংলাদেশকে দেখাচ্ছে গর্বিত দেশবাসীর এগিয়ে যাবার স্বপ্ন। আন্তর্জাতিক আইন লংঘন করে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের প্রতিবাদ ও সাম্প্রতিক পুশ ইন প্রতিরোধে অসামান্য অবদান রাখার পর বাহিনীর মনোবল ভাঙতে এই একপেশে প্রতিবেদনে শুধুমাত্র বিজিবিকে দায়ী করা হয়েছে বলে ধারণা করা যায়।

রামপুরার ঘটনায় প্রাণহানি নিশ্চিতই বেদনাদায়ক এবং কোনভাবেই মানা যায় না। দোষী ব্যক্তির অবশ্যই শাস্তি প্রাপ্য। তবে যে কোনও তদন্তে সততা কাম্য। নির্বাচিত ফুটেজ, অনুমান ও আংশিক তথ্য নিয়ে রচিত গল্পকে ‘ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং’ বলা যায় না। সুষ্ঠু বিচার প্রক্রিয়ায় যদি কোনও বিজিবি সদস্য দোষী প্রমাণিত হন, তার শাস্তি বিধানের বিষয়ে বিজিবিও সম্পূর্ণ একমত। বিডিআর বিদ্রোহের ক্ষত কাটিয়ে বিজিবি যখন পুনর্গঠিত হয়ে বর্তমানে একটি দক্ষ বাহিনী হিসাবে দায়িত্ব পালন করছে ঠিক তখনই বিজিবি’র মতো একটি First Line Defence Force এর মনোবল ভাঙ্গার দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনার একটি অংশ বলে প্রতীয়মান। সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর মনোবলকে দুর্বল করে দিলে কার লাভ বেশি? এর মধ্যে দেশের বাইরের কারো কি ইন্ধন রয়েছে ?

আস্থা/এম/এইচ/এস/কে

ট্যাগস :

বিচারাধীন বিষয়ে “নেত্র নিউজ” এর প্রতিবেদনে বিজিবির প্রতিবাদ

আপডেট সময় : ১১:১৯:১৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬

বিচারাধীন বিষয়ে “নেত্র নিউজ” এর প্রতিবেদনে বিজিবির প্রতিবাদ

মোফাজ্জল হোসেন ইলিয়াছ/মানিক পাটোয়ারীঃ

গতকাল সুইডেন ভিত্তিক অনলাইন সংবাদ মাধ্যম “নেত্র নিউজ” এর সোশ্যাল প্লাটফর্মে ‘(জুলাই অনুসন্ধান) জেনারেলের দায়মুক্তি’ শিরোনামে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলি নিয়ে প্রচারিত একটি দীর্ঘ প্রতিবেদনে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং বিজিবির ২৫তম মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে গুরুতর ও স্পর্শকাতর বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে। এই অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর খবরের তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়ে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদর দপ্তর থেকে বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা মোঃ শরীফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে সংবাদ মাধ্যমে প্রেরণ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বিজিবির গুলিতে ৮৬ জন নিহত হওয়ার দাবি, বিভিন্ন স্থানে বিজিবির নির্বিচার গুলিবর্ষণ, ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ এবং বিজিবির মহাপরিচালকের ভূমিকা সম্পর্কে এমনভাবে বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন এসব অভিযোগ ইতোমধ্যে বিচারিকভাবে প্রতিষ্ঠিত সত্য। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ উক্ত প্রতিবেদনের একপাক্ষিক, অনুমাননির্ভর, অতিরঞ্জিত ও বিভ্রান্তিকর উপস্থাপনার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছে।

প্রথমত, বিষয়টি বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন। বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগে কোনো অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা কিংবা কোনো ব্যক্তি বিশেষের কথিত কর্মকাণ্ডের দায় সম্পূর্ণ বাহিনী বা তার নেতৃত্বের ওপর আরোপ করা কোনোভাবেই সমীচীন নয়। বিচারাধীন বিষয়ে অভিযোগ, অনুসন্ধানের দাবি এবং আদালতে আইনগতভাবে প্রমাণিত সত্য—এই তিনটির মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য থাকা অপরিহার্য।

প্রতিবেদনটিতে বারবার “প্রমাণ”, “নিশ্চিত”, “হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণ”, “হত্যাযজ্ঞ” ইত্যাদি সিদ্ধান্তমূলক শব্দ ব্যবহার করে এমন একটি বয়ান তৈরি করা হয়েছে, যা পাঠক-দর্শকের কাছে বিচারিক সিদ্ধান্তের পূর্বেই একটি নির্দিষ্ট রায় প্রতিষ্ঠার প্রয়াস বলে প্রতীয়মান হয়। বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে সত্য ও তথ্য উদঘাটনের নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের চেয়ে ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক আক্রোশ ও আক্রমণের প্রবণতাই অধিকতর স্পষ্ট, যা সাংবাদিকতার বস্তুনিষ্ঠতা ও স্বীকৃত নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

দ্বিতীয়ত, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বিজিবির গুলিতে ৮৬ জন মৃত্যুর যে সংখ্যা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তা বাস্তবতা বিবর্জিত এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রতীয়মান। কোনো এলাকায় বিজিবি মোতায়েন ছিল—এ তথ্যকে ওই এলাকায় সংঘটিত প্রতিটি মৃত্যুর সঙ্গে সরাসরি বিজিবির গুলির সম্পর্ক হিসেবে উপস্থাপন করা তথ্য অনুসন্ধানের গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি হতে পারে না। কোনো মৃত্যুর জন্য দায় নির্ধারণ করতে হলে ঘটনাস্থলের আলামত, অস্ত্রের ব্যবহার, ব্যালিস্টিক ও ফরেনসিক পরীক্ষা, সংশ্লিষ্ট সদস্যদের অবস্থান, ডিউটি রেকর্ড এবং অন্যান্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রমাণের সমন্বিত বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, প্রতিবেদনে নরসিংদীর ড্রিম হলিডে পার্কে বিজিবির অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন এবং মাইক্রোবাস ও পিকআপের স্লাইডিং ডোর খোলা রেখে বিজিবি সদস্যদের টহল ও নির্বিচারে গুলিবর্ষণের যে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তা সম্পূর্ণ অসত্য ও বাস্তবতাবিবর্জিত। উক্ত সময়ে ড্রিম হলিডে পার্কে বিজিবির কোনো ক্যাম্পই ছিল না। ফলে সেখানে বিজিবির ক্যাম্প থেকে কথিতভাবে টহল পরিচালনা বা নির্বিচারে গুলিবর্ষণের প্রশ্নই ওঠে না। প্রতিবেদনে এমন একটি ঘটনাকে অত্যন্ত ফিল্মি ভাষায় উপস্থাপন করা হয়েছে, যার ভিত্তিই বাস্তব নয়।

চতুর্থত, সিলেটের গোলাপগঞ্জের ঘটনা নিয়েও প্রতিবেদনে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সময়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশে কয়েক রাউন্ড ফাঁকা ফায়ার করা হয়েছিল। পরবর্তীতে দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট নিজেই স্টেটমেন্ট দিয়ে জানিয়েছেন যে ওই ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি। অথচ এই ঘটনার সঙ্গে হতাহতের অভিযোগকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যাতে বিজিবির বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী গুলিবর্ষণের একটি পূর্বনির্ধারিত বয়ান প্রতিষ্ঠিত হয়। দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের প্রত্যক্ষ বক্তব্য ও প্রশাসনিক নথি যথাযথভাবে যাচাই না করে এ ধরনের উপস্থাপন নিঃসন্দেহে প্রশ্নবিদ্ধ।

পঞ্চমত, প্রতিবেদনে বিজিবির মহাপরিচালকের একটি বক্তব্যকে পরবর্তী হতাহতের ঘটনার সঙ্গে সরাসরি কার্যকারণ সম্পর্কযুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। কোনো সরকারি স্থাপনা রক্ষা, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ কিংবা দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময়ের বক্তব্যকে পরবর্তী প্রতিটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার “উসকানি” হিসেবে চিহ্নিত করতে হলে প্রত্যক্ষ ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন। শুধু বক্তব্যের আগে-পরে ঘটনাপ্রবাহ সাজিয়ে একটি অপরাধমূলক কার্যকারণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা সাংবাদিকতার বস্তুনিষ্ঠ অনুসন্ধানের বিকল্প হতে পারে না।

ষষ্ঠত, একজন বাহিনীপ্রধানের অধীনস্থ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলার ছবি বা ভিডিওকে পরবর্তীতে সংঘটিত কোনো ঘটনার বেআইনি নির্দেশের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। দায়িত্বপ্রাপ্ত ইউনিটের কমান্ডারের সঙ্গে বাহিনীপ্রধানের মতবিনিময় দায়িত্ব পালনের স্বাভাবিক অংশ। কোনো কর্মকর্তা কোনো ঘটনায় অভিযুক্ত হলে তার বিরুদ্ধে পৃথকভাবে তার নিজস্ব কার্যক্রম, আদেশ, যোগাযোগ এবং প্রমাণ যাচাই করতে হবে। সাংগঠনিক সম্পর্ককে সরাসরি অপরাধের প্রমাণ হিসেবে দেখানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

বিজিবি মহাপরিচালক প্রায় ৬০ হাজার সদস্যের একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীর সর্বোচ্চ কমান্ডার—কোনো নির্দিষ্ট এক-দুইজন কর্মকর্তা বা ইউনিটের কমান্ডার নন।

অতএব, কতিপয় সদস্যকে পৃথকভাবে গুলির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, অথচ একই সময়ে দায়িত্বে থাকা অন্য সদস্যরা সেই নির্দেশের আওতার বাইরে ছিলেন—এমন দাবি সুস্পষ্ট ও যাচাইযোগ্য প্রমাণ ছাড়া গ্রহণযোগ্য নয়। কোনো বক্তব্য, ছবি বা বিচ্ছিন্ন ঘটনার ভিত্তিতে মহাপরিচালকের সরাসরি নির্দেশ বা কমান্ড দায় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা বাস্তব কমান্ড কাঠামো ও দায়িত্ব বণ্টনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

সপ্তমত, প্রতিবেদনে নিহতদের স্বজন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে—যা অনুসন্ধানের একটি উপাদান হতে পারে। কিন্তু কোনো প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্যকে ব্যালিস্টিক, ফরেনসিক, চিকিৎসা, ময়নাতদন্ত, ঘটনাস্থলের আলামত এবং সংশ্লিষ্ট বাহিনীর ডিউটি রেকর্ড দিয়ে যাচাই না করে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না। বিশেষ করে কোন অস্ত্র থেকে কোন গুলি ছোড়া হয়েছে—এটি কেবল অনুমান বা দৃশ্যমান অস্ত্রের ধরন দেখে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

অষ্টমত, প্রতিবেদনে বিজিবিকে “হত্যাযজ্ঞে অংশগ্রহণকারী” এবং “নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের নির্মমভাবে দমনকারী” হিসেবে সামগ্রিকভাবে চিত্রিত করা হয়েছে। এ ধরনের ভাষা একটি সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের সিদ্ধান্ত প্রচারের শামিল। কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অপরাধের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তার তদন্ত ও বিচার আইনানুগ প্রক্রিয়ায় হতে পারে; কিন্তু ব্যক্তির সম্ভাব্য দায়কে পুরো বাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক দায় হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা ন্যায়সংগত নয়। এছাড়াও পুলিশ ও বিজিবি ব্যতীত অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের কর্তৃক বিভিন্ন স্থানে গুলি করা হলেও শুধুমাত্র বিজিবিকে মোটামুটি এককভাবে এবং পুলিশ বাহিনীকে কিছুটা উক্ত প্রতিবেদনে দায়ী করা হচ্ছে।

বিজিবি আরও উল্লেখ করতে চায়, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্তের নিরাপত্তা রক্ষায় বিজিবি অত্যন্ত দৃঢ়তা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে। সীমান্ত হত্যা রোধ, সীমান্তবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রতিবেশী দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত অপতৎপরতা মোকাবিলা এবং জোরপূর্বক পুশ-ইন প্রতিরোধে বিজিবি সীমান্তবাসীকে সঙ্গে নিয়ে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। এমন একটি সময়ে আদালতে বিচারাধীন একটি বিষয়কে নাটকীয় ও একপাক্ষিকভাবে উপস্থাপন করা বাহিনীর সদস্যদের মনোবল ক্ষুণ্ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা দুর্বল করার অপপ্রয়াস বলেই প্রতীয়মান হয়।

বিজিবি স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। একই সঙ্গে প্রত্যাশা করে, আদালতে বিচারাধীন কোনো বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য, প্রাসঙ্গিক নথি, প্রত্যক্ষ প্রমাণ এবং আইনগত অবস্থান যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া উচিৎ। বিচারাধীন বিষয়ে আগাম কোনো সিদ্ধান্ত বা একপাক্ষিক ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে বস্তুনিষ্ঠ, ভারসাম্যপূর্ণ ও তথ্যনির্ভর সংবাদ পরিবেশনই জনস্বার্থে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ।

বিজিবি কোনো সদস্যের বেআইনি কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় দেয় না এবং কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ক্ষেত্রে আইনানুগ তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল। একইভাবে, বিজিবির বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে তা যথাযথ প্রমাণসহ উপস্থাপন করা হোক—গণমাধ্যমের পর্দায় আগাম রায় হিসেবে নয়।

বিজিবি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, সত্য উদঘাটনের দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা এবং বিচারাধীন বিষয়ে আগাম রায় প্রচারের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। নেত্র নিউজের উক্ত প্রতিবেদনে এই সীমারেখা একাধিক ক্ষেত্রে অতিক্রম করা হয়েছে। ফলে প্রতিবেদনে বিজিবি ও এর মহাপরিচালক সম্পর্কে উপস্থাপিত একপাক্ষিক, অতিরঞ্জিত ও তথ্যগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ বক্তব্যের বিরুদ্ধে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানাচ্ছে। একই সঙ্গে সীমান্তের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় নিয়োজিত একটি রাষ্ট্রীয় বাহিনীর দায়িত্ব, মনোবল ও প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতার বিষয়টি দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার স্বার্থেই বিবেচনায় নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানানো হচ্ছে।

জুলাই গণঅভ্যূত্থানে রামপুরার ঘটনা নিয়ে The Daily Star পত্রিকায় উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে বিজিবি’র মতামত:

রাজধানীর রামপুরায় গত ১৯ জুলাই ২০২৪-এর সহিংসতার ঘটনায় বিজিবিকে এককভাবে দায়ী করে একটি উদ্দেশ্য প্রণোদিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। Daily Star এর মতন একটি মূলধারার পত্রিকার মাল্টিমিডিয়ায় আংশিক সত্য নিয়ে এমন মনগড়া, ভিউ প্রত্যাশী একটি প্রতিবেদন আমাদের বিষ্মিত করেছে। টেক গ্লোবাল ইন্সটিটিউটের ফরেনসিক গবেষণার বরাত দিয়ে ”রামপুরা হত্যাকাণ্ড: বিজিবি কি দায়ী? ভিডিও বিশ্লেষণ যা বলছে” এবং “Anatomy of BGB Shootings in Rampura”- শীর্ষক প্রতিবেদনে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (BGB)-কে একতরফাভাবে দোষারোপ করা হয়েছে।

বর্তমানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তত্ত্বাবধানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও অন্যান্য তদন্তকারী সংস্থার অধীনে গণঅভ্যুত্থান সময়কালীন বিভিন্ন হত্যা মামলার বিচার কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে চলমান রয়েছে। উক্ত বিচারকার্য সম্পন্ন করার জন্য বিজিবিও সম্পূর্ণভাবে সহযোগিতা প্রদানের জন্য প্রস্তুত। এমন এক সময়ে কিছু তদন্তনাধীন ও বিচারাধীন বিষয়কে নাটকীয়ভাবে আনা হলো যখন প্রত্যন্ত গ্রামবাসীকে সাথে নিয়ে বিজিবি সীমান্তে মাথা উঁচু করা নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছে। আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের প্রতিবাদ বা সাম্প্রতিক পুশ ইন প্রতিরোধে অসামান্য অবদান রাখার পর বাহিনীর মনোবল ভাঙতে আংশিক সত্য নিয়ে এই একপেশে রিপোর্টটি করা হয়েছে বলে প্রতীয়মান।

গত ১৯ জুলাই ২০২৪ এ রামপুরায় ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এর পাশাপাশি র‌্যাব, আনসার ও বিজিবি সদস্যরা উপস্থিত থাকলেও শুধুমাত্র বিজিবি’কে এককভাবে দায়ী করার বিষয়টি উক্ত প্রতিবেদনের পক্ষপাতিত্বকে সুষ্পষ্টভাবে প্রতীয়মান করেছে। আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতায় পরিচালিত তথাকথিত এই যৌথ অনুসন্ধান মূলত নির্বাচিত ফুটেজ ও অনুমাননির্ভর বর্ণনায় গড়ে উঠেছে, যার প্রধান অসংগতি সমূহ তুলে ধরা হলোঃ

বিজিবি সদস্যের ফায়ারিং এ গুলিবিদ্ধ হওয়া প্রসংগে:
প্রতিবেদনের শুরুতে কমলা রং এর টি শার্ট পরিহিত যুবক রমজান এর গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে যাওয়ার দৃশ্য প্রদর্শিত হয়। ভিডিওর ৩১ সেকেন্ডে প্রদর্শিত ফুটেজটি নিঃসন্দেহে কোন বহুতল ভবন এর উপর থেকে রেকর্ডকৃত। কে বা কারা যুবক রমজানের দিকে অস্ত্র তাক করেছিল তার সুনির্দিষ্ট তথ্য/প্রমান ভিডিওটিতে অনুপস্থিত। এছাড়াও রমজানের চতুর্পার্শ্বে আরো অন্যান্য ব্যক্তিবর্গ থাকায় আপাতভাবে মনে হচ্ছে তাকে কোন ছাদ থেকে অথবা উঁচু কোন স্থান থেকে গুলি করা হয়েছে, তা না হলে তার গায়ে না লেগে তার চতুর্পাশ্বে যারা রয়েছে, তাদের কারো গায়ে লাগার কথা। জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করার মানসে বিজিবি’র দিকে আঙ্গুলী প্রদর্শনপূর্বক ফুটেজটির অবতারনা করা হয়েছে। এছাড়াও ভিডিওর ১ মিনিট ১০ সেকেন্ড হতে ০১ মিনিট ২০ সেকেন্ড পর্যন্ত দেখানো হয়েছে অন্য একটি বাহিনীর ফায়ারিং এর দৃশ্য। Tech Global Institute এর ২০০ ছবি ও ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষনে ঐ বাহিনীর সদস্যদের ফায়ারিং এর চিত্র দৃশ্যায়িত হলেও অজানা কোন এক কারণে বাহিনীটির নাম উচ্চারিত হয়নি।

ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতি নিয়ে অপতথ্য:
১৬ জুলাই হতে ০৫ আগস্ট পর্যন্ত সমগ্র দেশে পূর্ববর্তী সরকারের আদেশে BGB মোতায়েন করতে হয়েছিল দণ্ডবিধি ১৮৯৮-এর ১২৮-১৩২ ধারা ও ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফ্‌লস রেগুলেশন ১৯২২-এর ৩১০, ৩১০-এ অনুযায়ী। প্রতিবেদনে ম্যাজিস্ট্রেট অনুপস্থিত থাকার দাবি করা হয়েছে, অথচ সরকারি নথিতে উক্ত তারিখে দায়িত্বরত ম্যাজিস্ট্রেটদের পূর্ণ তালিকা বিদ্যমান ও আদালতে উপস্থাপিত। ফুটেজে ম্যাজিস্ট্রেটকে দেখা যায়নি মানে এই নয় যে তিনি/তারা সেখানে ছিলেন না।

গুলির পরিমাণ নিয়ে বিভ্রান্তি:
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, বিজিবি কর্তৃক ৯৭২ রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়েছে। তবে এর মধ্যে যে বিজিবি’র ধ্বংসপ্রাপ্ত/পুড়ে যাওয়া জীপ এর অভ্যন্তরে থাকা ৬০০ রাউন্ড এর বেশি গোলাবারুদ ছিল, তা উল্লেখ করা হয়নি। অর্থাৎ উল্লেখিত গুলির মধ্যে অধিকাংশই পুড়ে যাওয়া গাড়ীর অভ্যন্তরে রাখা ধ্বংসপ্রাপ্ত গুলি এবং উর্ধ্বমুখে ছোড়া অধিকাংশ ফাঁকা গুলি ছিল।

শক্তি প্রয়োগ সংক্রান্ত অন্যান্য কিছু বিষয়:
BGB-র কোনও ‘র‍্যাপিড অ্যাকশান টিম মাঠে নামেনি, LMG কিংবা কোন ভারী অস্ত্র গাড়ির ছাদে বসানো হয়নি, কোথাও বালুর ব্যারিকেডও গড়ে তোলা হয়নি, আন্দোলনের বিরুদ্ধে কোন হেলিকপ্টার ব্যবহার করেনি। যখন গণগ্রেফতারের আদেশ হয়েছিল তখনও বিজিবির কোন টহল একজন ব্যক্তিকেও গ্রেফতার করেনি। ৫ ই আগস্ট পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত বিজিবির কোন স্থাপনায় কোন বিতর্কিত ব্যক্তিবর্গকে আশ্রয় গ্রহণ করতে দেওয়া হয়নি।

বিনা উস্কানিতে গুলি তত্ত্ব ভিত্তিহীন:
ভিডিও বিশ্লেষন বলছে-৫ মিনিটের ব্যবধানে ইট-বাঁশ-পেট্রলবোমা নিক্ষিপ্ত হওয়ার পরই বিজিবি সতর্ক-ফায়ার দেয়। পুলিশের ব্যর্থতায় স্থানীয় প্রশাসন জরুরি ভিত্তিতে বিজিবি’র সহায়তা চায়, যা প্রতিবেদক নিজের ভাষ্যেই স্বীকার করেছেন। অথচ পূর্ণ প্রেক্ষিত বাদ দিয়ে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ক্লিপ তুলে ধরে “বিনা উস্কানিতে গুলি’’ শীর্ষক উপসংহারে উপনীত হওয়া নিতান্তই সাংঘর্ষিক।

জন-সমর্থনের চিত্র:
আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর স্থাপনা সমূহ আন্দোলনকারীদের দ্বারা আক্রান্ত হলেও সারা দেশে বিজিবি’র সকল ক্যাম্প সমূহ অক্ষত ছিল। রামপুরা, বাড্ডা, গুলশানসহ বহু এলাকায় টেলিভিশন ফুটেজে দেখা যায় ছাত্র-জনতা বিজিবি’র টহলকে আক্রান্ত করেনি, বরঞ্চ অনেক স্থানে একই সাথে বিজিবি ও ছাত্র জনতাকে সহমতে সংহতি প্রকাশ করতে দেখা গিয়েছে। বিজিবির দুই একজন সদস্য যাকে/যাদেরকে প্রচলিত নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে বল প্রয়োগ করতে দেখা গেছে, তার/তাদের কারণে একটি বাহিনীকে সামগ্রিকভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘণকারী বলতে হলে দৃঢ়, যাচাইকৃত প্রমাণ দরকার, যেটি রিপোর্টে পূর্ণাঙ্গভাবে অনুপস্থিত। এছাড়াও উল্লেখ্য যে, এক্ষেত্রে বিজিবি কর্তৃক দ্রুততার সাথে ঘটনার দুই মাসের মধ্যেই প্রাথমিক তদন্ত সম্পন্ন করা হয়েছে।

এডিটকৃত গুলির শব্দ সংযোজন:
প্রতিবেদনের ১৪:২৪ মিনিটে ০৩ জন বিজিবি সদস্যকে দাড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তবে এডিটকৃত গুলির শব্দ সংযোজন করে এখানে একটি নাটকীয় সাউন্ড ইফেক্ট আনার অপচেষ্টা করা হয়েছে, যার মাধ্যমে বিজিবি’র সদস্যরা অনেক পরিমাণ গুলি করছেন মর্মে ভুল দৃশ্য উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে।

প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন:
এমন এক সময়ে কিছু তদন্তাধীন বিষয়কে নাটকীয়ভাবে উপস্থাপন করা হলো যখন প্রত্যন্ত গ্রামবাসীকে সাথে নিয়ে বিজিবি সীমান্তে মাথা উঁচু করা নতুন বাংলাদেশকে দেখাচ্ছে গর্বিত দেশবাসীর এগিয়ে যাবার স্বপ্ন। আন্তর্জাতিক আইন লংঘন করে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের প্রতিবাদ ও সাম্প্রতিক পুশ ইন প্রতিরোধে অসামান্য অবদান রাখার পর বাহিনীর মনোবল ভাঙতে এই একপেশে প্রতিবেদনে শুধুমাত্র বিজিবিকে দায়ী করা হয়েছে বলে ধারণা করা যায়।

রামপুরার ঘটনায় প্রাণহানি নিশ্চিতই বেদনাদায়ক এবং কোনভাবেই মানা যায় না। দোষী ব্যক্তির অবশ্যই শাস্তি প্রাপ্য। তবে যে কোনও তদন্তে সততা কাম্য। নির্বাচিত ফুটেজ, অনুমান ও আংশিক তথ্য নিয়ে রচিত গল্পকে ‘ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং’ বলা যায় না। সুষ্ঠু বিচার প্রক্রিয়ায় যদি কোনও বিজিবি সদস্য দোষী প্রমাণিত হন, তার শাস্তি বিধানের বিষয়ে বিজিবিও সম্পূর্ণ একমত। বিডিআর বিদ্রোহের ক্ষত কাটিয়ে বিজিবি যখন পুনর্গঠিত হয়ে বর্তমানে একটি দক্ষ বাহিনী হিসাবে দায়িত্ব পালন করছে ঠিক তখনই বিজিবি’র মতো একটি First Line Defence Force এর মনোবল ভাঙ্গার দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনার একটি অংশ বলে প্রতীয়মান। সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর মনোবলকে দুর্বল করে দিলে কার লাভ বেশি? এর মধ্যে দেশের বাইরের কারো কি ইন্ধন রয়েছে ?

আস্থা/এম/এইচ/এস/কে