আমি গরিবের ছেলে, লোভ সামলাতে পারিনি’, জবানবন্দিতে ‘সমন্বয়ক’ রিয়াদ
- আপডেট সময় : ১০:১১:৫০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬
- / ১০৩৫ বার পড়া হয়েছে
আমি গরিবের ছেলে, লোভ সামলাতে পারিনি’, জবানবন্দিতে ‘সমন্বয়ক’ রিয়াদ
আস্থা ডেস্কঃ
‘আমি গরিবের ছেলে। টাকার লোভ সামলাতে পারিনি। আমি ক্ষমা চাই।’ সাবেক সংসদ সদস্য শাম্মি আহম্মেদের বাসায় গিয়ে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং ১০ লাখ টাকা আদায়ের ঘটনায় আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এভাবেই নিজের অপরাধ স্বীকার করেছেন আবদুর রাজ্জাক ওরফে রিয়াদ।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক পরিচয় ব্যবহার করে সহযোগীদের নিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তিকে আওয়ামী লীগের দোসর আখ্যা দেওয়া, মামলা ও আটকের ভয় দেখিয়ে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় রিয়াদসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
সম্প্রতি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের উপপরিদর্শক ফিরোজ আহমেদ মুন্সী আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। আগামী ১০ নভেম্বর মামলাটির শুনানির দিন ধার্য করেছেন আদালত। মঙ্গলবার আদালত সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন- জানে আলম অপু, সাকাদাউন সিয়াম, সাদমান সাদাব, ইব্রাহিম হোসেন এবং একজন শিশু। ছয় আসামিই বর্তমানে জামিনে রয়েছেন। তাদের মধ্যে আবদুর রাজ্জাক ও জানে আলম অপু আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
যেভাবে ১০ লাখ টাকা আদায়:-
আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে রিয়াদ চাঁদা আদায়ের পুরো ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন। নিজেকে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক হিসেবে পরিচয় দেন তিনি। পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে ‘ফ্যাসিবাদী’ ব্যক্তিদের গ্রেফতারে পুলিশকে সহযোগিতা করার কথাও দাবি করেন।
জবানবন্দি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৭ জুলাই রাতে শাম্মি আহমেদ গুলশানের বাসায় অবস্থান করছেন; এমন খবর পেয়ে রিয়াদ ও তার সহযোগীরা থানায় যান। পরে পুলিশের একটি দলকে সঙ্গে নিয়ে ওই বাসায় অভিযান চালানো হয়। তবে সেখানে শাম্মি আহমেদকে পাওয়া যায়নি।
ফেরার সময় সহযোগী জানে আলম অপু বাসা থেকে একটি ইয়ারপড নিয়ে আসেন। সেটিতে ‘শাম্মি ইয়ারপড’ লেখা ছিল। সেটি ফেরত দেওয়ার কথা বলে পরদিন সকাল ১০টার দিকে তারা আবার ওই বাসায় যান। এ সময় অপু পানি পান করার অজুহাতে বাসার ভেতরে প্রবেশ করেন।
এরপর বাড়ির মালিককে বলা হয়, তারা জানেন তার স্ত্রী বাসায় রয়েছেন এবং তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হবে। গ্রেফতারের ভয় দেখিয়ে প্রথমে ৫০ লাখ টাকা দাবি করেন তারা। পরে ১০ লাখ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দিলে তাতে রাজি হন আসামিরা। রিয়াদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, আদায় করা ১০ লাখ টাকা তারা নিজেদের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ করে নেন।
বাকি ৪০ লাখ টাকা নিতে গিয়ে ধরা:-
জবানবন্দিতে রিয়াদ জানান, বাকি ৪০ লাখ টাকা আদায়ের জন্য ২০২৫ সালের ২৬ জুলাই বিকেল ৫টার দিকে তিনি ইব্রাহিম হোসেন, সাকাদাউন সিয়াম ও সাদমান সাদাবকে শাম্মি আহম্মেদের বাসায় পাঠান।
তার দাবি, পুলিশ তাকে ফাঁদে ফেলার উদ্দেশ্যে বাসায় যেতে বলেছিল। তখন তিনি একটি গোলচত্বরে অবস্থান করছিলেন। পুলিশের কথায় বিশ্বাস করে ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর বাড়ির মালিক থানায় খবর দেন। পরে পুলিশ এসে ঘটনাস্থল থেকে তাদের হাতেনাতে আটক করে।
সমন্বয়ক পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজির অভিযোগ:-
পিবিআইয়ের অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আসামিরা নিজেদের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ও সক্রিয় কর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেন। এই পরিচয় ব্যবহার করে তারা নিয়মিত বিভিন্ন থানায় যাতায়াত করতেন।
বিভিন্ন মামলার আসামি আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার এবং তাদের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য দিয়ে পুলিশের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন। একপর্যায়ে সেই পরিচয় ও যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তিকে আওয়ামী লীগের দোসর, সহযোগী কিংবা সমর্থক আখ্যা দিয়ে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ ওঠে তাদের বিরুদ্ধে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে তারা মামলা, গ্রেফতার ও হয়রানির ভয় দেখিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে চাঁদা দাবি এবং আদায় করতেন।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, রিয়াদের গ্রামের বাড়িতে পুরোনো ঘরের পাশে নতুন পাকা বাড়ি নির্মাণ করা হচ্ছিল। পাশাপাশি তিনি দামি গাড়িও কিনেছিলেন। পরিবারের আগের আর্থিক অবস্থার সঙ্গে তার নতুন জীবনযাপনের এই পার্থক্য স্থানীয়দের মধ্যে বিস্ময়ের সৃষ্টি করে।
অন্যদিকে, সে সময় রিয়াদের মা ছেলের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি ছিল, তার ছেলে এমন কাজ করতে পারে না; কেউ ষড়যন্ত্র করে তাকে চাঁদাবাজ হিসেবে উপস্থাপন করেছে।
প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা ও অন্তর্বর্তী সরকারের একাধিক উপদেষ্টার সঙ্গে তোলা ছবি পোস্ট করতেন রিয়াদ।
যেভাবে শুরু হয় মামলা:-
২০২৫ সালের ২৭ জুলাই গুলশান থানায় মামলাটি করেন শাম্মি আহম্মেদের স্বামী সিদ্দিক আবু জাফর (৭৫)। আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য শাম্মি আহম্মেদের পরিবারের বাসা ছিল গুলশান-২-এর ৮৩ নম্বর সড়কে।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, প্রথমে পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে ওই বাসায় অভিযান চালান আসামিরা। শাম্মি আহম্মেদকে না পেয়ে পুলিশ চলে যাওয়ার পর তারা আবার বাসাটিতে যান। এ সময় তার স্বামীকে আওয়ামী লীগের দোসর আখ্যা দিয়ে গ্রেফতারের ভয় দেখানো হয় এবং ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। পরে ১০ লাখ টাকা আদায় করেন তারা।
কয়েক দিন পর বাকি ৪০ লাখ টাকা নিতে আবারও বাসায় যান আসামিরা। বিষয়টি বুঝতে পেরে সিদ্দিক আবু জাফর তাৎক্ষণিকভাবে গুলশান থানায় খবর দেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে আবদুর রাজ্জাক, সাকাদাউন সিয়াম, সাদমান সাদাব, ইব্রাহিম হোসেন ও আমিনুল ইসলামকে আটক করে। পরবর্তী সময়ে জানে আলম অপুকেও আটক করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, সমন্বয়ক পরিচয়দানকারী আব্দুর রাজ্জাক রিয়াদের গ্রামের বাড়ি নোয়াখালী জেলার সেনবাগ উপজেলার নবীপুর ইউনিয়নের নবীপুর গ্রামে। তার বাবা আবু রায়হান পেশায় একজন রিকশাচালক ও দিনমজুর। তাঁর পরিবার ও প্রতিবেশীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রিয়াদের পরিবারটি অত্যন্ত দরিদ্র। তাঁর বাবা দীর্ঘদিন রিকশা চালিয়ে এবং পরবর্তীতে দিনমজুর হিসেবে কাজ করে অত্যন্ত অনটনের মধ্যে সংসার চালিয়েছেন। এমনকি রিয়াদের পড়াশোনার খরচও বিভিন্ন মানুষের আর্থিক সাহায্য ও দানের টাকায় চলত। তবে ৫ আগস্টের পর রিয়াদের হঠাৎ আর্থিক পরিবর্তনের কারণে তিনি আর রিকশা চালাতেন না বলে জানা যায়।
আস্থা/এমএইচ














