ডিএনএ পরীক্ষার অভাবে ঝুলে গেছে ধর্ষণ মামলা
- আপডেট সময় : ১২:১১:৫৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৬ মে ২০২৬
- / ৯৯৮ বার পড়া হয়েছে
ডিএনএ পরীক্ষার অভাবে ঝুলে গেছে ধর্ষণ মামলা
শেখ শাওন হোসেন শ্রাবণঃ
ধর্ষণ মামলার আসামির ডিএনএ না পাওয়ায় অনেক মামলায় সুরাহা করা যাচ্ছে না। আসামীদের আটক করতে না পারায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। রয়েছে অর্থ সংকটের কারণে রিএজেন্ট সংকটে দিনের পর দিন ঝুলে আছে ধর্ষণ মামলা। তবে ধর্ষণের শিকার ব্যক্তির এবং আলামতের ডিএনএ পরীক্ষা হয়।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) হিসাবে, তাদের ডিএনএ ল্যাবে এ পর্যন্ত আসা ধর্ষণ মামলার নমুনার প্রায় ২০ শতাংশ ক্ষেত্রে আসামিদের পাওয়া যাচ্ছে না। আর মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের অধীনে থাকা ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবের হিসাবে এই হার আরও বেশি।
দেশে ডিএনএ (ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড) পরীক্ষার জন্য কেবল দুটি ল্যাবরেটরি আছে। এর মধ্যে সিআইডির ল্যাবে নমুনা জমা এবং পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার হার বেশি। কিন্তু আসামির ডিএনএ নমুনা না পাওয়া গেলে কী হবে? এ প্রশ্নটির উত্তর এখনো পরিষ্কার নয়। এতে ভুক্তভোগীরাও হতাশ।
জৈবিক নমুনা অর্থাৎ রক্ত, লালা, বীর্য, চুল, মাংসপেশি, হাড় ইত্যাদি ডিএনএর গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। পরীক্ষার জন্য যথাযথভাবে আলামত সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করে তারপর সেগুলোর তুলনা করে মিল বা অমিল খুঁজে বের করা হয়।
তাই ডিএনএ পরীক্ষার জন্য আসা ধর্ষণ মামলায় আসামিকে আটকের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়। তাছাড়া আসামিকে আটক করতে না পারলে তদন্তও পরিপূর্ণ হয় না। একান্ত যখন আসামি পাওয়া যায় না তখন পারিপার্শ্বিক তথ্য-প্রমাণ দিয়ে চার্জশিট দেওয়া হয়।
সিআইডি ফরেনসিক ল্যাব সূত্র জানায়, ২০১৪ সাল থেকে ২০২৫ পর্যন্ত ২৪ হাজার ৪শ ৪৪টি মামলার ডিএনএ পরীক্ষার নমুনা নেওয়া হয়েছে। আলামতের সংখ্যা ৬৬ হাজার ১শ টি। মামলাগুলোর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ২৪ হাজার ২শ ৮১টির। ৬৫ হাজার ৫শ ৪৯টি আলামতের পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। এগুলোর মধ্যে ১শ ৬৩টি মামলা ঝুলে আছে। অভিযুক্তের নমুনা না পাওয়ায় ৫শ ৫১টি আলামতের পরীক্ষা অসম্পূর্ণই রয়ে গেছে।
ধীরগতিতে চলছে হাজার হাজার ধর্ষণ মামলার তদন্ত। এর মধ্যে ৭ থেকে ৮ বছর আগের মামলাও আছে। নির্ধারিত সময়ে আসামি ও ভুক্তভোগীর ডিএনএ এবং রাসায়নিক পরীক্ষার প্রতিবেদন হাতে না পাওয়ায় এসব মামলার তদন্ত শেষ করতে পারছে না তদন্ত কর্মকর্তারা।
এ অবস্থায় ধর্ষণ মামলার সঠিক তদন্তের জন্য দ্রুত ডিএনএ পরীক্ষার ওপর জোর দিয়েছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাটি। সময়মতো ডিএনএ প্রতিবেদন পেতে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞদের প্রয়োজনে আইনি বাধ্যবাধকতার মধ্যে আনার কথাও বলছে পুলিশ।
পুলিশ সদর দপ্তর সম্প্রতি সারা দেশে তদন্তাধীন হাজার হাজার ধর্ষণ মামলার বিলম্বের কারণ খোঁজার উদ্যোগ নেয়। সেই অনুসন্ধান করতে গিয়ে পুলিশ দেখেছে, তদন্তে বিলম্বের নেপথ্য কারণ ডিএনএ ও রাসায়নিক প্রতিবেদন সঠিক সময়ে না পাওয়া।
এ নিয়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্য, দেশের কোনো আইনে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞদের ডিএনএ বা রাসায়নিক প্রতিবেদন দিতে সময় নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়নি, যা থাকা উচিত ছিল। আইনে বাধ্যবাধকতা থাকলে প্রতিবেদন পেতে এ রকম বিলম্ব হতো না।
এ ছাড়া ২০১৪ সালের ‘ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড (ডিএনএ) আইন’-এ ডিএনএ প্রোফাইল-সংবলিত রিপোর্ট আদালতে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে বলে উল্লেখ আছে। তবে এই আইনে কত দিনের মধ্যে রিপোর্ট দিতে হবে, সে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি।
আইনে যা আছে বর্তমানে বাংলাদেশে ধর্ষণ মামলার বিচার হয় ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুসারে। তবে বিশেষ এই আইনে ডিএনএ ও রাসায়নিক পরীক্ষার বিষয়ে কোনো বিধান ছিল না। ২০২০ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধন করে এ-সংক্রান্ত নতুন বিধান সংযুক্ত করা হয়। আইনের ৩২ক ধারায় বলা হয়েছে, এই আইনের অধীন সংঘটিত অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি এবং অপরাধের শিকার ব্যক্তির মেডিক্যাল পরীক্ষা ছাড়াও, উক্ত ব্যক্তির সম্মতি থাকুক বা না থাকুক, তার ডিএনএ পরীক্ষা করতে হবে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মূল উদ্দেশ্য দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। কিন্তু ডিএনএ রিপোর্ট দিতে অহেতুক বিলম্ব হলে তা আইনের মূল উদ্দেশ্যকে চরমভাবে বাধাগ্রস্ত করে।
ডিএনএ ল্যাবরেটরি ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. এ এম পারভেজ রহিম বলেন, সারা দেশের সব পরীক্ষার চাপ পড়েছে আমাদের এই একটি ল্যাবের ওপর। তারপরও নমুনা সংগ্রহের পর দ্রুত প্রতিবেদন দেওয়া হয়। তবে নমুনা সময়মতো না পাওয়া গেলে সে ক্ষেত্রে আমাদের করণীয় কিছু থাকে না। পৃথিবীর কোথাও রাসায়নিক পরীক্ষার প্রতিবেদনে কোনো নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া নেই। এটা যেন তেনভাবে দেওয়া যায় না।
দৈনিক আস্থা/এমএইচ



















