ঢাকা ০৩:১০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৭ মে ২০২৬, ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জুলাইয়ে ১২৭ কিলোমিটার দূরে থেকেও ৩৫ গুলি লেগেছে বলে মামলা দায়ায়

Astha DESK
  • আপডেট সময় : ০২:৫৩:৫৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৭ মে ২০২৬
  • / ৯৯৮ বার পড়া হয়েছে

জুলাইয়ে ১২৭ কিলোমিটার দূরে থেকেও ৩৫ গুলি লেগেছে বলে মামলা দায়ায়

মোফাজ্জল হোসেন ইলিয়াছঃ

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর হামলায় রিমন নামে এক কিশোর গুরুতর আহত হওয়ার অভিযোগে মামলা করেছিলেন তাঁর বাবা মোঃ মামুন। এজাহারে তিনি উল্লেখ করেন, তাঁর ছেলের শরীরে ৩৫ থেকে ৪০টি গুলি লেগেছিল। পাশাপাশি ধারালো অস্ত্র ও রড দিয়ে কুপিয়ে-পিটিয়ে জখম করা হয়।

তবে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, আহত হওয়া তো দূরের কথা, কথিত ভুক্তভোগী ছিলেন ঘটনাস্থল থেকে ১২৭ কিলোমিটার দূরে; ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায়। তিনি নিজেও সমকালের কাছে তা স্বীকার করেছেন।

এদিকে অভিযোগ মিথ্যা হলেও হয়রানি হতে হয়েছে এ মামলায় অভিযুক্ত অনেক সাধারণ মানুষকে। ৬৯ আসামির মধ্যে বেশ কয়েকজনের কাছ থেকে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে।

মামলার বাদী বলছেন, আসামিদের কাউকেই তিনি চেনেন না। তাঁকে দিয়ে মামলাটি করানো হয়েছে।

২০২৪ সালের অক্টোবরে আদালতে করা মামলাটির এজাহারে বলা হয়েছে, ওই বছরের ৪ আগস্ট দুপুর ১২টার দিকে ছাত্র আন্দোলন চলাকালে বাদীর ছেলে রিমন যাত্রাবাড়ী কাঁচাবাজার থেকে বাসায় ফিরছিলেন। তখন যাত্রাবাড়ী মাতৃসদন হাসপাতালের পাশের রাস্তায় দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তাঁর ওপর আক্রমণ করা হয়। ডেমরা থানার তৎকালীন পরিদর্শক (অপারেশন) সুব্রত কুমার পোদ্দার শটগান দিয়ে গুলি করলে রিমনের পেটের বাম পাশে জখম হয়ে গুলি বেরিয়ে যায়।

সেই সঙ্গে মহানগর পুলিশের ওয়ারী বিভাগের তৎকালীন উপকমিশনার ইকবাল হোসেন, অতিরিক্ত উপকমিশনার নুরুল আমিন, যাত্রাবাড়ী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) জাকির হোসেন, একই থানার এসআই সেলিম সরকার ও ডিবির এসআই সিকদার মুহিতুল আলম শটগান দিয়ে কিছুটা দূর থেকে গুলি করলে ছেলের পিঠে ১০ থেকে ১২ স্থানে জখম হয়।

বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের সহসভাপতি এ কে এম শাহ আলম রামদা দিয়ে তাঁর ডান পায়ের উরুতে কোপ দেন। ডেমরা থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোঃ পরশ রড দিয়ে তাঁর হাঁটুতে আঘাত করলে জখম হয়। বিভিন্ন ঠিকানার আরও ১৫ জনের নাম উল্লেখ করে বলা হয়, তারাও শটগান দিয়ে গুলি ছুড়লে রিমনের দুই হাঁটুর নিচে ৩৫-৪০টি গুলি লাগে।

তিনি (রিমন) রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তার ওপর লুটিয়ে পড়লে অন্যরা রড, চায়নিজ কুড়াল, লাঠি, চাপাতি দিয়ে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে ও কুপিয়ে গুরুতর জখম করেন। এই হামলাকারীর মধ্যে রয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য সাঈদ খোকন, কাজী ফিরোজ রশীদ, শ ম রেজাউল করিম, শেখ ফজলে নূর তাপস, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল।

এ ব্যাপারে জানতে রিমনের সঙ্গে যোগাযোগ করে সমকাল। মামলায় বয়স ২০ বছর বলা হলেও তিনি দাবি করেন, তাঁর বর্তমান বয়স ১৭। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় একটি গাড়ির ওয়ার্কশপে কাজ করেন। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টে আমি নিজের এলাকাতেই ছিলাম, ঢাকায় যাইনি। মামলায় যে ঘটনার কথা বলা হয়েছে সে ব্যাপারে কিছুই জানি না। আমি কোনো ঘটনায় আহত হইনি। বাবা কেন এই মামলা করেছেন সেটি তিনিই ভালো বলতে পারবেন। এ বিষয়ে আমার সঙ্গে কোনো আলোচনা করেননি।

তিনি জানান, ২০০৮ সালে তাঁর বাবা মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশে যান। তখন থেকেই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ নেই। পরে তিনি দেশে ফিরে আরেকটি বিয়ে করে আলাদা থাকেন। তাদের খোঁজ নেন না। তারাও যোগাযোগ করেন না।

মিথ্যা মামলায় হয়রানিঃ- ভুয়া ঘটনা সাজিয়ে করা এ মামলার আসামিদের দাবি, অযথাই তাদের হয়রানি করা হয়েছে। অনেকের কাছে টাকা নেওয়া হয়েছে পুলিশে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে।

মামলার ৪৩ নম্বর আসামি ব্যবসায়ী সাদেক হোসেন বিজুর বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল বারেক বলেন, মামলা হওয়ার কিছুদিন পর ৮ থেকে ১০ জন বাসায় এসে ‘মব’ সৃষ্টির চেষ্টা চালায়। বিজুকে পুলিশের কাছে ধরিয়ে দেওয়া হবে বলে ভয় দেখায়। পরে একজন বলে, কিছু টাকা-পয়সা দিয়ে বিষয়টি মিটমাট করে ফেলেন। তবে আমি কোনো টাকা দেইনি। অন্যদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার কথা শুনেছি।

মামলার আরেক আসামি মোতালিব প্লাজার ব্যবসায়ী দীন ইসলাম দীপু বলেন, কোনো কারণ ছাড়াই আমাকে আসামি করা হয়েছে। বাদীকে আমি চিনি না, তিনিও আমাকে চেনেন না। কেউ তাঁকে দিয়ে এ কাজ করিয়েছেন। যোগাযোগ করার পর আমার নাম বাদ দিয়েছে। সেজন্য কিছু টাকা খরচ করতে হয়েছে।

এদিকে হয়রানি এড়াতে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা দিয়েছেন এমন অন্তত পাঁচজনের তথ্য পেয়েছে সমকাল। তবে তারা নাম প্রকাশ করতে চাননি। তাদের ভাষ্য, টাকা দিয়ে হলেও ঝামেলা থেকে বেঁচেছেন।

দায়িত্ব নিচ্ছেন না কেউঃ- মামলার বাদী মোঃ মামুন নিজেকে ঢাকা মহানগর দক্ষিণের ৬৪ নম্বর ওয়ার্ড (পূর্ব) বিএনপির নেতা হিসেবে পরিচয় দেন। মিথ্যা মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মামলা তো আমি করি নাই। আমারে দিয়া করাইছে আরেকজন। আসামি কাউরেই আমি চিনি না। যে মামলা করাইছে আসামিও সেই দিয়া দিছে।’ তবে তিনি কারও কাছে কোনো টাকা নেননি বলে দাবি করেন।

কে তাকে দিয়ে মামলা করিয়েছে? জানতে চাইলে প্রথম কথোপকথনে তিনি ৬৪ নম্বর ওয়ার্ড (পূর্ব) বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল ভূঁইয়া তুহিনের কথা বলেন। তবে কিছুক্ষণ পর তিনি ফোন করে বলেন, তুহিন তাঁকে দিয়ে মামলা করাননি। তাহলে কে করিয়েছে? জানতে চাইলে তিনি উত্তর দেননি।

এদিকে মামলায় আসামি হয়ে হয়রানির শিকার অনেকের অভিযোগ, মামুন মূলত তুহিনের সঙ্গেই চলাফেরা করেন। পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে টাকাও নিয়েছেন তুহিনের লোকজনই।

তুহিন দাবি করেন, রিমনের গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা মিথ্যা নয়। তিনি আওয়ামী লীগের ভয়ে এখন সত্য প্রকাশ করছেন না। ছেলের আহত হওয়ার ঘটনায় মামুন আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করায় তিনি মামলা দায়েরের পরামর্শ দেন। এ জন্য অ্যাডভোকেট মোজাম্মেল হক ভূঁইয়াকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু আইনজীবী এমন কিছু লোককে আসামি করেছেন, যাদের তিনি চেনেন না। টাকা নেওয়ার অভিযোগ মিথ্যা বলে দাবি করেন তিনি।

অ্যাডভোকেট মোজাম্মেল হক ভূঁইয়া বলেন, বাদী যদি এসে অভিযোগ করেন তাঁর ছেলে আহত, তাহলে আইনজীবীর কী দোষ? আমি তো আর তদন্ত করতে যাইনি। পরে বাদী যোগাযোগ না রাখায় আমিও মামলা ফলো করিনি। আর ইসমাইল ভূঁইয়া তুহিনের সঙ্গেই বাদী এসেছিলেন। তারাই আসামিদের নাম-ঠিকানা দিয়েছেন। তুহিন যদি আসামিদের না চেনেন, তাহলে এফিডেভিট করে অনেক আসামির নাম বাদ দিলেন কীভাবে?

চূড়ান্ত প্রতিবেদনঃ-আদালতে দায়ের (সিআর) মামলাটির তদন্ত করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। সংস্থাটির ঢাকা মহানগর দক্ষিণের বিশেষায়িত তদন্ত ও অভিযান শাখার অনুসন্ধানেও এজাহারের বক্তব্যের সত্যতা মেলেনি।

এই ইউনিটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তানজিনা আক্তার বলেন, সাক্ষ্য-প্রমাণে এই সিআর পিটিশনের সত্যতা না পাওয়ায় আমরা চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছি। আদালত থেকে এখনও কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি।

পিবিআইর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবার জয়নগর বাজার এলাকায় এসএস পাইপের দোকানে কাজ করতেন রিমন। আন্দোলনের সময় তিনি ঢাকায় যাননি। তদন্তকালে রিমনের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরের অবস্থানও কসবায় ছিল। এ ছাড়া ঘটনার আগে-পরেও রিমনের ঢাকায় অবস্থানের তথ্য মেলেনি। (সূত্র-দৈনিক সমকাল)।

দৈনিক আস্থা/এমএইচ

ট্যাগস :

জুলাইয়ে ১২৭ কিলোমিটার দূরে থেকেও ৩৫ গুলি লেগেছে বলে মামলা দায়ায়

আপডেট সময় : ০২:৫৩:৫৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৭ মে ২০২৬

জুলাইয়ে ১২৭ কিলোমিটার দূরে থেকেও ৩৫ গুলি লেগেছে বলে মামলা দায়ায়

মোফাজ্জল হোসেন ইলিয়াছঃ

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর হামলায় রিমন নামে এক কিশোর গুরুতর আহত হওয়ার অভিযোগে মামলা করেছিলেন তাঁর বাবা মোঃ মামুন। এজাহারে তিনি উল্লেখ করেন, তাঁর ছেলের শরীরে ৩৫ থেকে ৪০টি গুলি লেগেছিল। পাশাপাশি ধারালো অস্ত্র ও রড দিয়ে কুপিয়ে-পিটিয়ে জখম করা হয়।

তবে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, আহত হওয়া তো দূরের কথা, কথিত ভুক্তভোগী ছিলেন ঘটনাস্থল থেকে ১২৭ কিলোমিটার দূরে; ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায়। তিনি নিজেও সমকালের কাছে তা স্বীকার করেছেন।

এদিকে অভিযোগ মিথ্যা হলেও হয়রানি হতে হয়েছে এ মামলায় অভিযুক্ত অনেক সাধারণ মানুষকে। ৬৯ আসামির মধ্যে বেশ কয়েকজনের কাছ থেকে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে।

মামলার বাদী বলছেন, আসামিদের কাউকেই তিনি চেনেন না। তাঁকে দিয়ে মামলাটি করানো হয়েছে।

২০২৪ সালের অক্টোবরে আদালতে করা মামলাটির এজাহারে বলা হয়েছে, ওই বছরের ৪ আগস্ট দুপুর ১২টার দিকে ছাত্র আন্দোলন চলাকালে বাদীর ছেলে রিমন যাত্রাবাড়ী কাঁচাবাজার থেকে বাসায় ফিরছিলেন। তখন যাত্রাবাড়ী মাতৃসদন হাসপাতালের পাশের রাস্তায় দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তাঁর ওপর আক্রমণ করা হয়। ডেমরা থানার তৎকালীন পরিদর্শক (অপারেশন) সুব্রত কুমার পোদ্দার শটগান দিয়ে গুলি করলে রিমনের পেটের বাম পাশে জখম হয়ে গুলি বেরিয়ে যায়।

সেই সঙ্গে মহানগর পুলিশের ওয়ারী বিভাগের তৎকালীন উপকমিশনার ইকবাল হোসেন, অতিরিক্ত উপকমিশনার নুরুল আমিন, যাত্রাবাড়ী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) জাকির হোসেন, একই থানার এসআই সেলিম সরকার ও ডিবির এসআই সিকদার মুহিতুল আলম শটগান দিয়ে কিছুটা দূর থেকে গুলি করলে ছেলের পিঠে ১০ থেকে ১২ স্থানে জখম হয়।

বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের সহসভাপতি এ কে এম শাহ আলম রামদা দিয়ে তাঁর ডান পায়ের উরুতে কোপ দেন। ডেমরা থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোঃ পরশ রড দিয়ে তাঁর হাঁটুতে আঘাত করলে জখম হয়। বিভিন্ন ঠিকানার আরও ১৫ জনের নাম উল্লেখ করে বলা হয়, তারাও শটগান দিয়ে গুলি ছুড়লে রিমনের দুই হাঁটুর নিচে ৩৫-৪০টি গুলি লাগে।

তিনি (রিমন) রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তার ওপর লুটিয়ে পড়লে অন্যরা রড, চায়নিজ কুড়াল, লাঠি, চাপাতি দিয়ে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে ও কুপিয়ে গুরুতর জখম করেন। এই হামলাকারীর মধ্যে রয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য সাঈদ খোকন, কাজী ফিরোজ রশীদ, শ ম রেজাউল করিম, শেখ ফজলে নূর তাপস, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল।

এ ব্যাপারে জানতে রিমনের সঙ্গে যোগাযোগ করে সমকাল। মামলায় বয়স ২০ বছর বলা হলেও তিনি দাবি করেন, তাঁর বর্তমান বয়স ১৭। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় একটি গাড়ির ওয়ার্কশপে কাজ করেন। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টে আমি নিজের এলাকাতেই ছিলাম, ঢাকায় যাইনি। মামলায় যে ঘটনার কথা বলা হয়েছে সে ব্যাপারে কিছুই জানি না। আমি কোনো ঘটনায় আহত হইনি। বাবা কেন এই মামলা করেছেন সেটি তিনিই ভালো বলতে পারবেন। এ বিষয়ে আমার সঙ্গে কোনো আলোচনা করেননি।

তিনি জানান, ২০০৮ সালে তাঁর বাবা মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশে যান। তখন থেকেই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ নেই। পরে তিনি দেশে ফিরে আরেকটি বিয়ে করে আলাদা থাকেন। তাদের খোঁজ নেন না। তারাও যোগাযোগ করেন না।

মিথ্যা মামলায় হয়রানিঃ- ভুয়া ঘটনা সাজিয়ে করা এ মামলার আসামিদের দাবি, অযথাই তাদের হয়রানি করা হয়েছে। অনেকের কাছে টাকা নেওয়া হয়েছে পুলিশে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে।

মামলার ৪৩ নম্বর আসামি ব্যবসায়ী সাদেক হোসেন বিজুর বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল বারেক বলেন, মামলা হওয়ার কিছুদিন পর ৮ থেকে ১০ জন বাসায় এসে ‘মব’ সৃষ্টির চেষ্টা চালায়। বিজুকে পুলিশের কাছে ধরিয়ে দেওয়া হবে বলে ভয় দেখায়। পরে একজন বলে, কিছু টাকা-পয়সা দিয়ে বিষয়টি মিটমাট করে ফেলেন। তবে আমি কোনো টাকা দেইনি। অন্যদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার কথা শুনেছি।

মামলার আরেক আসামি মোতালিব প্লাজার ব্যবসায়ী দীন ইসলাম দীপু বলেন, কোনো কারণ ছাড়াই আমাকে আসামি করা হয়েছে। বাদীকে আমি চিনি না, তিনিও আমাকে চেনেন না। কেউ তাঁকে দিয়ে এ কাজ করিয়েছেন। যোগাযোগ করার পর আমার নাম বাদ দিয়েছে। সেজন্য কিছু টাকা খরচ করতে হয়েছে।

এদিকে হয়রানি এড়াতে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা দিয়েছেন এমন অন্তত পাঁচজনের তথ্য পেয়েছে সমকাল। তবে তারা নাম প্রকাশ করতে চাননি। তাদের ভাষ্য, টাকা দিয়ে হলেও ঝামেলা থেকে বেঁচেছেন।

দায়িত্ব নিচ্ছেন না কেউঃ- মামলার বাদী মোঃ মামুন নিজেকে ঢাকা মহানগর দক্ষিণের ৬৪ নম্বর ওয়ার্ড (পূর্ব) বিএনপির নেতা হিসেবে পরিচয় দেন। মিথ্যা মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মামলা তো আমি করি নাই। আমারে দিয়া করাইছে আরেকজন। আসামি কাউরেই আমি চিনি না। যে মামলা করাইছে আসামিও সেই দিয়া দিছে।’ তবে তিনি কারও কাছে কোনো টাকা নেননি বলে দাবি করেন।

কে তাকে দিয়ে মামলা করিয়েছে? জানতে চাইলে প্রথম কথোপকথনে তিনি ৬৪ নম্বর ওয়ার্ড (পূর্ব) বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল ভূঁইয়া তুহিনের কথা বলেন। তবে কিছুক্ষণ পর তিনি ফোন করে বলেন, তুহিন তাঁকে দিয়ে মামলা করাননি। তাহলে কে করিয়েছে? জানতে চাইলে তিনি উত্তর দেননি।

এদিকে মামলায় আসামি হয়ে হয়রানির শিকার অনেকের অভিযোগ, মামুন মূলত তুহিনের সঙ্গেই চলাফেরা করেন। পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে টাকাও নিয়েছেন তুহিনের লোকজনই।

তুহিন দাবি করেন, রিমনের গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা মিথ্যা নয়। তিনি আওয়ামী লীগের ভয়ে এখন সত্য প্রকাশ করছেন না। ছেলের আহত হওয়ার ঘটনায় মামুন আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করায় তিনি মামলা দায়েরের পরামর্শ দেন। এ জন্য অ্যাডভোকেট মোজাম্মেল হক ভূঁইয়াকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু আইনজীবী এমন কিছু লোককে আসামি করেছেন, যাদের তিনি চেনেন না। টাকা নেওয়ার অভিযোগ মিথ্যা বলে দাবি করেন তিনি।

অ্যাডভোকেট মোজাম্মেল হক ভূঁইয়া বলেন, বাদী যদি এসে অভিযোগ করেন তাঁর ছেলে আহত, তাহলে আইনজীবীর কী দোষ? আমি তো আর তদন্ত করতে যাইনি। পরে বাদী যোগাযোগ না রাখায় আমিও মামলা ফলো করিনি। আর ইসমাইল ভূঁইয়া তুহিনের সঙ্গেই বাদী এসেছিলেন। তারাই আসামিদের নাম-ঠিকানা দিয়েছেন। তুহিন যদি আসামিদের না চেনেন, তাহলে এফিডেভিট করে অনেক আসামির নাম বাদ দিলেন কীভাবে?

চূড়ান্ত প্রতিবেদনঃ-আদালতে দায়ের (সিআর) মামলাটির তদন্ত করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। সংস্থাটির ঢাকা মহানগর দক্ষিণের বিশেষায়িত তদন্ত ও অভিযান শাখার অনুসন্ধানেও এজাহারের বক্তব্যের সত্যতা মেলেনি।

এই ইউনিটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তানজিনা আক্তার বলেন, সাক্ষ্য-প্রমাণে এই সিআর পিটিশনের সত্যতা না পাওয়ায় আমরা চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছি। আদালত থেকে এখনও কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি।

পিবিআইর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবার জয়নগর বাজার এলাকায় এসএস পাইপের দোকানে কাজ করতেন রিমন। আন্দোলনের সময় তিনি ঢাকায় যাননি। তদন্তকালে রিমনের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরের অবস্থানও কসবায় ছিল। এ ছাড়া ঘটনার আগে-পরেও রিমনের ঢাকায় অবস্থানের তথ্য মেলেনি। (সূত্র-দৈনিক সমকাল)।

দৈনিক আস্থা/এমএইচ