ঢাকা ০১:০৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পাঁচ চিঠি লিখে সাংবাদিক পুলকের আত্মহনন!

Astha DESK
  • আপডেট সময় : ১১:৩২:৫২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / ১০০৫ বার পড়া হয়েছে

পাঁচ চিঠি লিখে সাংবাদিক পুলকের আত্মহনন!

বরিশাল প্রতিনিধিঃ

বরিশালে দৈনিক সমকালের ব্যুরো কার্যালয় থেকে পত্রিকাটির সাবেক ব্যুরো প্রধান পুলক চ্যাটার্জির ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। সে বরিশাল প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক।

আজ শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা ৭টার দিকে নগরীর প্যারারা রোডে সমকালের বরিশাল কার্যালয়ের দরজা ভেঙে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ সময় তার কাছ থেকে একটি সুইসাইড নোটসহ পাঁচটি চিঠি উদ্ধার করা হয়েছে।

তিনি ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে সমকাল থেকে চাকরি হারান। পরিবারে তার স্ত্রী ও একমাত্র কন্যাসন্তান রয়েছে।

সমকালের বর্তমান বরিশাল ব্যুরো প্রধান সুমন চৌধুরী বলেন, চাকরি চলে যাওয়ার পর পুলক চ্যাটার্জি মাঝে মাঝে অফিসে এসে সময় কাটাতেন এবং পত্রিকা পড়তেন। তার অনুরোধে অফিসের প্রধান গেটের একটি চাবিও তাকে দেওয়া হয়েছিল।

সুমন চৌধুরী বলেন, ‘প্রায় এক থেকে দেড় মাস ধরে দাদা অফিসে আসতেন না। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে বৌদির (পুলক চ্যাটার্জির স্ত্রী) সঙ্গে দেখা হলে দাদার বিষয়ে জানতে চাই। তিনি অফিসে আসেন না কেন, সে বিষয়ে কথা হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘অফিসের পিয়ন দীপক ছুটিতে আছেন। শুক্রবার কাজের চাপ কম থাকায় আমিও অফিসে আসতে দেরি করি। এর মধ্যে বিকেল ৩টার দিকে বৌদি ফোন করে বলেন, পুলক দাদা তার ফোন রিসিভ করছেন না। সন্ধ্যা ৬টার দিকে তিনি আবার ফোন করে একই কথা জানান। আমি প্রেস ক্লাবে গিয়ে দাদাকে খুঁজে না পেয়ে অফিসে আসি। এসে দেখি, ভেতর থেকে দরজা বন্ধ।’

সুমন বলেন, ‘পরে দরজার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে দেখি, অফিসের সামনের কক্ষে গলায় ফাঁস দেওয়া অবস্থায় পুলক দাদার দেহ ঝুলছে। তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি থানা পুলিশকে জানাই। পাশাপাশি একই ভবনে থাকা যুগান্তর কার্যালয়ের ব্যুরো প্রধান আকতার ফারুক শাহীনসহ অন্যদের খবর দিই। পরে পুলিশ এসে দরজা ভেঙে মরদেহ উদ্ধার করে।’

বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মামুন উল ইসলাম বলেন, সুরতহাল শেষে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। ১টি সুইসাইড নোটসহ ৫টি চিঠি উদ্ধার করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর সঠিক কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।’

পাঁচ চিঠিঃ-
জানা গেছে, সুইসাইড নোটের পাশাপাশি স্ত্রী ও একমাত্র কন্যা, ছোট ভাই, বরিশাল প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এবং সমকালের বরিশাল ব্যুরো প্রধানের উদ্দেশে পৃথক চারটি চিঠি লিখে গেছেন পুলক চ্যাটার্জি। এসব চিঠিতে তিনি তার শারীরিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করেছেন।

সুইসাইড নোট

‘আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। আমি শরীরের রোগ-যন্ত্রণা সহ্য করতে পারছি না। সুস্থ থাকার জন্য অনেক চেষ্টা করেছি। ভারতের ভেলোর পর্যন্ত ডাক্তার দেখিয়েছি, কিন্তু সুস্থ হতে পারিনি। অসুস্থতা আমাকে সামাজিকভাবেও পিছিয়ে দিচ্ছে। শরীরের যন্ত্রণার কারণে কোথাও যেতে পারতাম না। আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। প্রশাসনের কাছে অনুরোধ, কোনো প্রকার হয়রানি না করে আমার লাশ আমার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হোক।’ নোটের নিচে নিজের নাম ও তারিখ লেখা রয়েছে।

স্ত্রী ও একমাত্র কন্যাকে লেখা চিঠিঃ-

‘প্রিয়াঙ্কা/প্রকৃতি, আমাকে ক্ষমা করে দিও। পৃথিবীতে কারও জন্য কিছু থেমে থাকে না। প্রকৃতি, তুমি পড়াশোনা ও গান শেখা চালিয়ে যেও। প্রিয়াঙ্কা, আমার অনুপস্থিতি তোমার জীবনে পূরণ হওয়ার নয়। তারপরও কারও জন্য কিছু থেমে থাকে না। তোমার দীপক (চান) ভাইয়ের সঙ্গে থেকো। দীপক তোমাদের আগলে রাখবে।’

ছোট ভাইকে লেখা চিঠিঃ-

‘দীপক (চান), ইতি বিদায়। প্রিয়াঙ্কা ও প্রকৃতিকে আগলে রাখিস। তোর ওপর অনেক বড় বোঝা চাপিয়ে গেলাম। আমাকে ক্ষমা করে দিস। মুক্তিযোদ্ধা ভাতা ও আমার ব্যাংক হিসাবের ব্যাপারে দেবাশীষের সঙ্গে আলাপ করে পদক্ষেপ নিস। প্রিয়াঙ্কা ও প্রকৃতিকে তোর কাছে রাখিস।’

সমকাল ব্যুরো প্রধানকে লেখা চিঠিঃ-

‘সুমন, তোমাকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলার জন্য দুঃখিত। একসঙ্গে প্রায় দেড় যুগ কাজ করেছি। কখনো কোনো কষ্ট দিয়ে থাকলে ক্ষমা করে দিও। যদি পার, সমকালে আমার পাওনা টাকা আদায় করে তোমার বউদির হাতে দিও।’

বরিশাল প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদককে লেখা চিঠিঃ-

‘জাকির, বিদায়। তোমার সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতি। আমার মরদেহ প্রশাসনিক হয়রানি ছাড়া পরিবারের কাছে দেওয়ার চেষ্টা করিও। আমি যেহেতু স্বেচ্ছায় আত্মহনন করলাম, তাই ময়নাতদন্ত করার প্রয়োজন নেই। পারলে তোমার বউদি ও প্রকৃতির মাঝে মাঝে খোঁজ নিও।

আস্থা/এমএইচ

ট্যাগস :

পাঁচ চিঠি লিখে সাংবাদিক পুলকের আত্মহনন!

আপডেট সময় : ১১:৩২:৫২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পাঁচ চিঠি লিখে সাংবাদিক পুলকের আত্মহনন!

বরিশাল প্রতিনিধিঃ

বরিশালে দৈনিক সমকালের ব্যুরো কার্যালয় থেকে পত্রিকাটির সাবেক ব্যুরো প্রধান পুলক চ্যাটার্জির ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। সে বরিশাল প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক।

আজ শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা ৭টার দিকে নগরীর প্যারারা রোডে সমকালের বরিশাল কার্যালয়ের দরজা ভেঙে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ সময় তার কাছ থেকে একটি সুইসাইড নোটসহ পাঁচটি চিঠি উদ্ধার করা হয়েছে।

তিনি ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে সমকাল থেকে চাকরি হারান। পরিবারে তার স্ত্রী ও একমাত্র কন্যাসন্তান রয়েছে।

সমকালের বর্তমান বরিশাল ব্যুরো প্রধান সুমন চৌধুরী বলেন, চাকরি চলে যাওয়ার পর পুলক চ্যাটার্জি মাঝে মাঝে অফিসে এসে সময় কাটাতেন এবং পত্রিকা পড়তেন। তার অনুরোধে অফিসের প্রধান গেটের একটি চাবিও তাকে দেওয়া হয়েছিল।

সুমন চৌধুরী বলেন, ‘প্রায় এক থেকে দেড় মাস ধরে দাদা অফিসে আসতেন না। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে বৌদির (পুলক চ্যাটার্জির স্ত্রী) সঙ্গে দেখা হলে দাদার বিষয়ে জানতে চাই। তিনি অফিসে আসেন না কেন, সে বিষয়ে কথা হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘অফিসের পিয়ন দীপক ছুটিতে আছেন। শুক্রবার কাজের চাপ কম থাকায় আমিও অফিসে আসতে দেরি করি। এর মধ্যে বিকেল ৩টার দিকে বৌদি ফোন করে বলেন, পুলক দাদা তার ফোন রিসিভ করছেন না। সন্ধ্যা ৬টার দিকে তিনি আবার ফোন করে একই কথা জানান। আমি প্রেস ক্লাবে গিয়ে দাদাকে খুঁজে না পেয়ে অফিসে আসি। এসে দেখি, ভেতর থেকে দরজা বন্ধ।’

সুমন বলেন, ‘পরে দরজার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে দেখি, অফিসের সামনের কক্ষে গলায় ফাঁস দেওয়া অবস্থায় পুলক দাদার দেহ ঝুলছে। তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি থানা পুলিশকে জানাই। পাশাপাশি একই ভবনে থাকা যুগান্তর কার্যালয়ের ব্যুরো প্রধান আকতার ফারুক শাহীনসহ অন্যদের খবর দিই। পরে পুলিশ এসে দরজা ভেঙে মরদেহ উদ্ধার করে।’

বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মামুন উল ইসলাম বলেন, সুরতহাল শেষে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। ১টি সুইসাইড নোটসহ ৫টি চিঠি উদ্ধার করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর সঠিক কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।’

পাঁচ চিঠিঃ-
জানা গেছে, সুইসাইড নোটের পাশাপাশি স্ত্রী ও একমাত্র কন্যা, ছোট ভাই, বরিশাল প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এবং সমকালের বরিশাল ব্যুরো প্রধানের উদ্দেশে পৃথক চারটি চিঠি লিখে গেছেন পুলক চ্যাটার্জি। এসব চিঠিতে তিনি তার শারীরিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করেছেন।

সুইসাইড নোট

‘আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। আমি শরীরের রোগ-যন্ত্রণা সহ্য করতে পারছি না। সুস্থ থাকার জন্য অনেক চেষ্টা করেছি। ভারতের ভেলোর পর্যন্ত ডাক্তার দেখিয়েছি, কিন্তু সুস্থ হতে পারিনি। অসুস্থতা আমাকে সামাজিকভাবেও পিছিয়ে দিচ্ছে। শরীরের যন্ত্রণার কারণে কোথাও যেতে পারতাম না। আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। প্রশাসনের কাছে অনুরোধ, কোনো প্রকার হয়রানি না করে আমার লাশ আমার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হোক।’ নোটের নিচে নিজের নাম ও তারিখ লেখা রয়েছে।

স্ত্রী ও একমাত্র কন্যাকে লেখা চিঠিঃ-

‘প্রিয়াঙ্কা/প্রকৃতি, আমাকে ক্ষমা করে দিও। পৃথিবীতে কারও জন্য কিছু থেমে থাকে না। প্রকৃতি, তুমি পড়াশোনা ও গান শেখা চালিয়ে যেও। প্রিয়াঙ্কা, আমার অনুপস্থিতি তোমার জীবনে পূরণ হওয়ার নয়। তারপরও কারও জন্য কিছু থেমে থাকে না। তোমার দীপক (চান) ভাইয়ের সঙ্গে থেকো। দীপক তোমাদের আগলে রাখবে।’

ছোট ভাইকে লেখা চিঠিঃ-

‘দীপক (চান), ইতি বিদায়। প্রিয়াঙ্কা ও প্রকৃতিকে আগলে রাখিস। তোর ওপর অনেক বড় বোঝা চাপিয়ে গেলাম। আমাকে ক্ষমা করে দিস। মুক্তিযোদ্ধা ভাতা ও আমার ব্যাংক হিসাবের ব্যাপারে দেবাশীষের সঙ্গে আলাপ করে পদক্ষেপ নিস। প্রিয়াঙ্কা ও প্রকৃতিকে তোর কাছে রাখিস।’

সমকাল ব্যুরো প্রধানকে লেখা চিঠিঃ-

‘সুমন, তোমাকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলার জন্য দুঃখিত। একসঙ্গে প্রায় দেড় যুগ কাজ করেছি। কখনো কোনো কষ্ট দিয়ে থাকলে ক্ষমা করে দিও। যদি পার, সমকালে আমার পাওনা টাকা আদায় করে তোমার বউদির হাতে দিও।’

বরিশাল প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদককে লেখা চিঠিঃ-

‘জাকির, বিদায়। তোমার সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতি। আমার মরদেহ প্রশাসনিক হয়রানি ছাড়া পরিবারের কাছে দেওয়ার চেষ্টা করিও। আমি যেহেতু স্বেচ্ছায় আত্মহনন করলাম, তাই ময়নাতদন্ত করার প্রয়োজন নেই। পারলে তোমার বউদি ও প্রকৃতির মাঝে মাঝে খোঁজ নিও।

আস্থা/এমএইচ