অস্বাভাবিক মৃত্যুই কি এখন স্বাভাবিক
- আপডেট সময় : ০৬:১১:০০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬
- / ১০০১ বার পড়া হয়েছে
অস্বাভাবিক মৃত্যুই কি এখন স্বাভাবিক
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
দেশে খুনের ঘটনা নতুন কিছু নয়। অপরাধ, সহিংসতা, পারিবারিক বিরোধ, রাজনৈতিক সংঘাত, সব সমাজেই কমবেশি থাকে। কিন্তু কোনো কোনো হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারের মৃত্যু নয়, তা গোটা সমাজের নিরাপত্তাবোধকে নাড়িয়ে দেয়।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে এমন কিছু হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, যেগুলো মানুষকে শুধু শোকাহত করেনি, গভীর আতঙ্কের মধ্যেও ফেলেছে। প্রশ্ন উঠছে, আমরা কি এমন এক বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছি, যেখানে অস্বাভাবিক মৃত্যুই ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে?
গত জুনে দেশে প্রতিদিন গড়ে ১০টির বেশি হত্যাকাণ্ডের খবর সামনে আসার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। জুন পেরিয়ে জুলাই শেষ হয়েছে, আগস্টও শেষের পথে। সরকারের ছয় মাসও পূর্ণ হয়েছে।
কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি কতটা হয়েছে, সেই প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। বরং একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড মানুষের মনে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতিকে আরও গভীর করছে।
এই লেখা যখন লেখা হচ্ছে, তখন পুরো জাতি বিমর্ষ রংপুরের একটি হত্যাকাণ্ডে। রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিজ ঘরে হত্যা করা হয়েছে।
তালাবদ্ধ ঘরের ভেতর পড়ে ছিল চারটি রক্তাক্ত দেহ। পুলিশ দুজন তরুণকে আটক করেছে এবং প্রাথমিকভাবে জানিয়েছে, ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিতভাবে হত্যার ঘটনা ঘটতে পারে। হত্যার পর ঘটনাটিকে অন্য খাতে নিতে ঘরের জিনিসপত্র ছড়িয়ে দিয়ে ডাকাতির নাটক সাজানোর চেষ্টার কথাও বলা হয়েছে।
এ ধরনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ একই সময়ে লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে নিজ ঘরে মা ও তিন মেয়েকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা, মিরপুরে শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তোফাজ্জল হোসেনকে ভাত খাওয়ানোর পর পিটিয়ে হত্যা—এমন একের পর এক ঘটনা মানুষের স্বাভাবিক জীবন সম্পর্কে ধারণাটাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
মানুষের সবচেয়ে মৌলিক নিরাপত্তা হলো নিজের ঘরে নিরাপদ থাকা। নিজের পরিবারের সঙ্গে নিরাপদে ঘুমাতে পারা। সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়ে নিশ্চিন্ত থাকা। পথে বের হয়ে ফিরে আসতে পারার নিশ্চয়তা। কিন্তু যখন নিজের ঘরেই একটি পুরো পরিবার নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, যখন একটি শিশুও নিরাপদ থাকে না, যখন একজন মানুষকে গুজব, সন্দেহ কিংবা মবের হাতে পিটিয়ে হত্যা করা সম্ভব হয়, তখন সংকটটি শুধু আইনশৃঙ্খলার থাকে না। তা পরিণত হয় সামাজিক আস্থার সংকটে।
বর্তমান সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর সবচেয়ে বড় প্রত্যাশাগুলোর একটি ছিল মানুষের স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনা। চাঁদাবাজি বন্ধ হবে, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার হবে, খুনোখুনি ও সহিংসতা কমবে, এটাই ছিল সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা। কিন্তু পাওয়া পরিসংখ্যান যদি তুলনা করা হয়, তাহলে উদ্বেগের কারণ যথেষ্ট।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান ও বিভিন্ন সংস্থার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ ছয় মাসে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন ১ হাজার ৪শ ১৯ জন। ওই সময়ে ডাকাতির ঘটনা ছিল ৩শ ৮টি এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ৯ হাজার ৩শ ৬৭টি। অন্যদিকে নির্বাচিত সরকারের প্রথম ছয় মাসে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ১ হাজার ৭শ ৮৯টি, ডাকাতি ও দস্যুতার ঘটনা ১ হাজার ১শ ৬৯টি এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ১১ হাজার ১শ ৬৫টি। এ সময়ে চুরির ঘটনায় ৬ হাজার ৩শ ৯৯টি এবং অপহরণের ঘটনায় ৫শ ১২টি মামলা হয়েছে। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশ আক্রান্ত হওয়ার মামলাও হয়েছে ৩শ ১৭টি।
সংখ্যা কখনো পুরো বাস্তবতা প্রকাশ করে না। কিন্তু সংখ্যার প্রবণতা উপেক্ষাও করা যায় না। বিশেষ করে যখন অপরাধের পরিসংখ্যানের পাশাপাশি মানুষের অভিজ্ঞতাও একই ধরনের উদ্বেগের কথা বলে। তবে এখানে একটি কঠিন বাস্তবতাও স্বীকার করতে হবে। ২০২৪ সালের গণআন্দোলনে সরকারের পতনের সময় পুলিশ ব্যাপক জনরোষের মুখে পড়ে।
থানায় হামলা, অগ্নিসংযোগ, পুলিশ হত্যার পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক অস্ত্র লুটের ঘটনাও ঘটে। এতে পুলিশের মনোবল ভেঙে পড়ে। পরবর্তী সময়ে মব উচ্ছৃঙ্খলতার ঘটনায় প্রশাসনিক দুর্বলতা বা প্রশ্রয়ের অভিযোগ সেই মনোবলকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
একটি কার্যকর রাষ্ট্রে পুলিশকে জনগণের আস্থার প্রতিষ্ঠান হতে হয়; একই সঙ্গে পুলিশেরও জানতে হয়, আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে রাষ্ট্র তার পাশে থাকবে।
সেই আস্থা এখনো পুরোপুরি ফিরেছে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন। তবে পুলিশ দুর্বল ছিল—এই ব্যাখ্যা দিয়ে প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের দায় শেষ করা যাবে না। কারণ অপরাধ দমন শুধু পুলিশের কাজ নয়। গোয়েন্দা সক্ষমতা, বিচারব্যবস্থার গতি, প্রসিকিউশনের দক্ষতা, স্থানীয় প্রশাসনের সক্রিয়তা এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক সদিচ্ছা—সবকিছু মিলেই একটি কার্যকর আইনশৃঙ্খলা কাঠামো তৈরি হয়।
আর সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, অপরাধীর মনে শাস্তির ভয় থাকতে হবে। কেউ যদি বিশ্বাস করে যে মানুষ হত্যা করেও পার পাওয়া সম্ভব, তাহলে আইন যতই কঠোর হোক, কাগজে থাকা আইন সমাজকে নিরাপদ করতে পারবে না। একইভাবে মব যদি মনে করে সন্দেহ হলেই কাউকে পিটিয়ে শাস্তি দেওয়া যায়, তাহলে রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তাই প্রশ্নের মুখে পড়ে। তোফাজ্জল হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা তাই শুধু একজন মানুষের মৃত্যু নয়; এটি আইনের শাসনের ওপরও আঘাত।
মব কোনো বিচার নয়। জনরোষ কোনো আদালত নয়। সন্দেহ কোনো প্রমাণ নয়। আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজব কোনো রায় নয়।
আজকের বাংলাদেশে সবচেয়ে জরুরি যে বার্তাটি রাষ্ট্রকে দিতে হবে, সেটি হলো, কোনো মানুষই আইনের ঊর্ধ্বে নয় এবং কোনো মানুষই আইনের বাইরে নয়। অপরাধী যত প্রভাবশালী হোক, তাকে আইনের মুখোমুখি হতে হবে। আর নিরপরাধ মানুষকে রাষ্ট্রকে সুরক্ষা দিতে হবে।
কারণ একটি সমাজে শুধু খুনের সংখ্যা বাড়লেই সংকট তৈরি হয় না; মানুষের মনে যদি এই ধারণা জন্ম নেয় যে ‘আমার সঙ্গেও এমন হতে পারে’, তখনই সংকট গভীর হয়। রংপুরের চারটি লাশ, রায়পুরের একটি পরিবারের নিঃশেষ হয়ে যাওয়া, একটি শিশুর ওপর নৃশংসতা কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন মানুষকে পিটিয়ে হত্যা—প্রতিটি ঘটনা আলাদাভাবে আমাদের সেই ভয়টিই মনে করিয়ে দেয়।
আমরা কি স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে পারব? নিজের ঘরে? রাস্তায়? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে? কর্মস্থলে? এমনকি রাষ্ট্রের বিচার পাওয়ার অপেক্ষাতেও?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর শুধু সরকারের কাছে নয়, রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের কাছে। তবে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব সরকারের। ছয় মাস কোনো সরকারের জন্য দীর্ঘ সময় নয়, আবার আইনশৃঙ্খলার মতো জরুরি বিষয়ে ছয় মাস একেবারে কম সময়ও নয়। মানুষ এখন পরিসংখ্যানের ব্যাখ্যা নয়, দৃশ্যমান নিরাপত্তা চায়। তারা চায় অপরাধী গ্রেপ্তার হোক, তদন্ত দ্রুত শেষ হোক, বিচার হোক এবং শাস্তি নিশ্চিত হোক।
রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব মানুষের জীবন রক্ষা করা। উন্নয়ন, অর্থনীতি, অবকাঠামো—সবকিছুর আগে মানুষের নিরাপত্তা। কারণ মানুষ যদি সন্ধ্যার পর ঘরে ফেরার নিশ্চয়তা না পায়, সন্তানকে বাইরে পাঠাতে ভয় পায়, নিজের ঘরের দরজাও নিরাপদ মনে না করে, তাহলে রাষ্ট্রের সাফল্যের অন্য সব সূচকই অর্থহীন হয়ে পড়ে। অস্বাভাবিক মৃত্যু কখনো স্বাভাবিক হতে পারে না। একের পর এক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ নয়।
আজ সবচেয়ে জরুরি হলো, আমরা যেন মৃত্যুর খবর শুনে শুধু কয়েক মুহূর্তের জন্য শোকাহত না হই; বরং রাষ্ট্র ও সমাজকে এমন জায়গায় নিয়ে যাই, যেখানে প্রতিটি হত্যাকাণ্ডই ব্যতিক্রম হিসেবে বিবেচিত হবে। মানুষের মনে আবার সেই সহজ বিশ্বাসটি ফিরিয়ে আনতে হবে, এই দেশে আইন আছে, রাষ্ট্র আছে, তাই আমি নিরাপদ। এই বিশ্বাসটিই যদি হারিয়ে যায়, তাহলে অস্বাভাবিক মৃত্যুই একদিন সত্যিই স্বাভাবিক হয়ে উঠবে। আর তার চেয়ে ভয়ংকর রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা আর কিছু হতে পারে না।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও বিশ্লেষক
আস্থা/এমএইচ




















