জামায়াত ছাড়তে ধর্মভিত্তিক ৪ দলকে হেফাজতের চাপ
- আপডেট সময় : ০১:০৬:২৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৮ মে ২০২৬
- / ১০১৫ বার পড়া হয়েছে
জামায়াত ছাড়তে ধর্মভিত্তিক ৪ দলকে হেফাজতের চাপ
আহসান হাবিব:
জামায়াতে ইসলামীর জোট ছাড়তে নির্বাচনের পরও ধর্মভিত্তিক চারটি দলকে চাপ দিচ্ছে হেফাজতে ইসলাম। এ দলগুলোর শীর্ষ নেতারা হেফাজতের পদেও রয়েছেন। তাদের বার্তা দেওয়া হয়েছে, জামায়াত জোট বা হেফাজত– যে কোনো একটি বেছে নিতে হবে। তবে তারা জোট ও হেফাজত দুই জায়াগায় থাকতে চান। উদাহরণ দিচ্ছেন, বিএনপির সঙ্গে থাকা কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক দলগুলোর নেতারা দুই জায়গায় থাকতে পারলে, তারা কেন পারবেন না?
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদীর মতবাদকে ভ্রান্ত আখ্যা দেন কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতের আমির শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী এবং মহাসচিব সাজিদুর রহমান। জামায়াতকে ইসলামবিরোধী আখ্যা দিয়ে ভোট না দিতে আহ্বান জানিয়েছিলেন।
যদিও হেফাজত ঘনিষ্ঠ বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলন এবং নেজামে ইসলাম পার্টি জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের শরিক। বাংলাদেশ খেলাফতের আমির মামুনুল হক হেফাজতের যুগ্ম-মহাসচিব। দলটির শীর্ষ নেতাদের প্রায় সবাই হেফাজতের বিভিন্ন পদে রয়েছেন।
খেলাফতের অপরাংশের আমির আবদুল বাছিত আজাদ এবং মহাসচিব ড. আহমেদ আবদুল– দুজনেই হেফাজতের নায়েবে আমির। নেজামে ইসলামের মহাসচিব মুসা বিন ইজহার হেফাজতের যুগ্ম-মহাসচিব। খেলাফত আন্দোলনের আমিরে শরিয়ত হাবিবুল্লাহ মিয়াজী হেফাজতের নায়েবে আমির।
হেফাজত-সংশ্লিষ্ট জমিয়ত উলামায়ে ইসলামের দুই অংশ বিএনপির সঙ্গে জোট করে নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। ইসলামী ঐক্যজোট নির্বাচনী সমঝোতা না করলেও, বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলছে। এই তিনটি দলের নেতাদের বিএনপি ছাড়তে চাপ দিচ্ছে না হেফাজত।
জামায়াত জোটে থাকা হেফাজত-সংশ্লিষ্ট চারটি দলগুলোর একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করে বলছেন, হেফাজত ও জোট দুই জায়গাতেই থাকবেন তারা। দীর্ঘদিনের সম্পর্কসহ নানা কারণে হেফাজত সংগঠন হিসেবে বিএনপির দিকে বেশি ঝুঁকে গেছে। হেফাজত ছাড়বেন না, তবে এই অবস্থার পরিবর্তন আনার চেষ্টা করবেন।
এই চারটি দল ছাড়াও জামায়াত, এনসিপিসহ ১১টি দল মিলে নির্বাচনী ঐক্য গঠন করেছিল। নির্বাচনের পর দলগুলো সিদ্ধান্ত নিয়েছে সম্মিলিতভাবে বিরোধী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে সংসদে। জুলাই সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের দাবিতে সংসদের বাইরে জোটবদ্ধ থাকবে। এই দাবিতে গত শনিবারও রাজশাহীতে সমাবেশ করেছে ১১ দল। আগামী জুলাই পর্যন্ত জোটের কর্মসূচি চলবে।
নির্বাচনের পরও চাপ
জামায়াতের জোটে ছিল চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলনও। দলটি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই জামায়াতের কড়া সমালোচক ছিল। তবে গত বছরের সেপ্টেম্বরে দল দুটি প্রকাশ্য সম্পর্কে আসে। সংস্কারের দাবিতে যুগপৎ আন্দোলন করে। তবে আসন বণ্টন নিয়ে টানাপোড়েন জোট ভাঙে জামায়াত ও চরমোনাই পীরের।
এরপর থেকে আবারও জামায়াতের সমালোচনায় মুখর হয়েছে ইসলামী আন্দোলন। এই দলটি হেফাজতের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট না হলেও, একই ভাষায় সমালোচনা করছে। নির্বাচনের আগে হেফাজতের শীর্ষ ‘মুরব্বিরা’ জামায়াতের বিরুদ্ধে যেমন প্রচার করেছেন, ভোটের পর কওমিভিত্তিক চার দলকে চাপ দিচ্ছেন জামায়াত ছাড়তে।
চারটি দলের সঙ্গে আলোচনা করতে গত ২৮ এপ্রিল কমিটি গঠন করে দেন হেফাজত আমির। এক মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দেবে হেফাজতের নায়েবে আমির মাওলানা আইয়ুব বাবুনগরী নেতৃত্বাধীন এই কমিটি। কমিটি বৈঠকও করে দলগুলোর সঙ্গে। এতে গুঞ্জন ছড়ায় জামায়াত জোট না ছাড়া দলগুলোর নেতাদের হেফাজত থেকে বহিষ্কার করা হবে।
এসব আলোচনার মধ্যেই রোববার মামুনুল হক চট্টগ্রামের জামিয়া ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় গিয়ে দেখা করেছেন হেফাজত আমিরের সঙ্গে। বৈঠকের পর মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী দাবি করেন, হেফাজতের মধ্যে বিভেদ নেই।
মামুনুল হক এমন মত দিয়েছেন যে, হেফাজতের আমির যে বিশ্বাস ও আকিদার কথা বলেন তা বাংলাদেশ খেলাফতসহ সংগঠনের যুক্ত সব দল তা ধারণ করে। বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতা ও জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে বিভিন্ন মত ও পথের দল নিয়ে ১১ দলীয় ঐক্য গঠিত হয়। জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন দলের সঙ্গে আকিদা, বিশ্বাস ও আদর্শিক পার্থক্য আগের মতোই রয়েছে। ১১ দল আদর্শিক নয়, রাজনৈতিক ঐক্য।
বৈঠকে উপস্থিত থাকা হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব ও বাংলাদেশ খেলাফতের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আতাউল্লাহ আমীন বক্তব্য হলো, হেফাজত অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে রয়েছে, থাকবে। সংগঠনে যুক্ত নেতারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে রয়েছেন। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত তারা রাজনৈতিক বাস্তবতা অনুযায়ী নিয়ে থাকেন। এই বক্তব্যই হেফাজত আমিরকে জানানো হয়েছে। তিনি সবার মুরব্বি হিসেবে নিশ্চয় বিষয়টি বুঝেছেন। জোট না ছাড়লে হেফাজত থেকে বহিষ্কারের গুঞ্জন সঠিক নয়।
যদিও এবারের ৫ মে হেফাজত এককভাবে কর্মসূচি করতে পারেনি। ঢাকায় ইসলামী ঐক্যজোটের নেতারা লালবাগে কর্মসূচি করেন। মাওলানা মামুনুল হক হেফাজতের পরিবর্তে ‘শাপলা স্মৃতি সংসদ’-এর ব্যানারে কর্মসূচি করেন। এতে জামায়াত জোটে থাকা হেফাজত নেতারা আসেন।
বৈঠকে যায়নি বাকি তিন দল
খেলাফত মজলিসের অপরাংশ, নেজামে ইসলাম এবং খেলাফত আন্দোলনকেও ডাকা হয়েছিল রোববারের বৈঠকে। তবে তাদের সবার পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করেন মামুনুল হক। এই দলগুলোর একাধিক নেতারা বলেন, হেফাজত যে জামায়াত ছাড়তে চাপ দিচ্ছে তাতে তারা নীতিগতভাবে একমত নন। তারা হেফাজত আমিরের কমিটিকে জানিয়েছেন, একসময় জামায়াতের সঙ্গেই বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটে ছিলেন তারা। তখন যদি প্রশ্ন তোলা না হয়, তবে এখন কেন আপত্তি করা হচ্ছে?
নির্বাচনের আগে হেফাজতের শীর্ষ নেতারা দুই দফা গুলশান কার্যালয়ে গিয়ে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতৃত্বের সঙ্গে দেখা করেন। বিএনপিকে নির্বাচনে সমর্থন করেছেন। হেফাজতের পদে থাকা জমিয়ত নেতাদের মধ্যে উবায়দুল্লাহ ফারুক, জুনায়েদ আল হাবিব, মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দি, মনির হোসেইন কাসেমী নির্বাচন করেন বিএনপির সমর্থনে। ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করেন জমিয়তের অপরাংশের নেতা রশিদ ওয়াক্কাস। এই উদাহরণ দিয়ে জামায়াত জোটে থাকা হেফাজত নেতারা বলেছেন, জমিয়ত যদি বিএনপির জোটে থেকে হেফাজতে থাকতে পারে, তাহলে তারা কেনো পারবেন না?
জামায়াত জোটে থাকা খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ডা. আহমদ আবদুল কাদের বক্তব্য হলো, হেফাজত সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক সংগঠন। এই সংগঠনের নেতারা রাজনৈতিকভাবে কে কোন দলে জোটে থাকবে, তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। কোন দল কার সঙ্গে জোট করবে, তা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। যা সব দল ও নেতার জন্যই প্রযোজ্য।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং ১১ দলের সমন্বয়কারী হামিদুর রহমান আযাদ-এর বক্তব্য হলো, কোনো দলই জোট ছাড়ছে না। বরং জোট দৃঢ় হচ্ছে জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী সংস্কারের জন্য।
দৈনিক আস্থা/এমএইচ



















