অদ্ভুত মামলা, নজিরবিহীন কারসাজি বাদী-পুলিশ-কর্তৃপক্ষ ত্রিমুখী চাপে পিষ্ট সাংবাদিক
- আপডেট সময় : ০৯:৪৩:০১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬
- / ১০০১ বার পড়া হয়েছে
অদ্ভুত মামলা, নজিরবিহীন কারসাজি
বাদী-পুলিশ-কর্তৃপক্ষ ত্রিমুখী চাপে পিষ্ট সাংবাদিক
আস্থা/ডেস্কঃ
কুড়িগ্রামের উলিপুর থানার বুড়াবুড়ি সাতভিটা এলাকার চাঁদ মিয়ার ছেলে আশিকুর রহমান (২৪) রাষ্ট্র্রের চোখে একজন ‘জুলাই শহীদ’। এ জন্য স্বীকৃতির পাশাপাশি অনুদানের ৩০ লাখ টাকাও বুঝিয়ে দেওয়া হয় পরিবারকে।
আন্দোলনের ধারে কাছে ছিলেন না আশিকুর। মস্তিষ্কে অদ্ভুত মামলা, নজিরবিহীন কারসাজি সংক্রমণজনিত অসুস্থতার চিকিৎসায় পুরোটা সময় ছিলেন হাসপাতালের বিছানায়। ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনে ‘ব্রেন ইনফেকশন’ লেখা থাকলেও আশিকুরের ডেথ সার্টিফিকেটে মৃত্যুর কারণ লেখা হয় ‘হেড ইনজুরি’।
তথ্য-উপাত্ত ও নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর আশিকুর রহমান মূলত মস্তিষ্কে সংক্রমণজনিত (পরিবারের সদস্যদের ভাষায় ব্রেন টিউমার) কারণেই মারা গেছেন।
এরপর তাঁর মৃত্যুর এক মাস ১০ দিন পর কুড়িগ্রাম সদর থানায় একটি হত্যা মামলা (নম্বর ১৩) করা হয়। মামলায় আসামির সংখ্যা ১শ ৪ জন। যেখানে ৩ জন সাংবাদিক। গত বছরের ১৫ জানুয়ারি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় জুলাই শহীদদের নামের তালিকাসংবলিত গেজেট প্রকাশ করে। ওই গেজেটে ২শ ১৭ নম্বরে আছে আশিকুরের নাম।
আশিকুর রহমানের মামলা নিয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা ও জানা গেছে তাঁর চিকিৎসাপত্র এবং মৃত্যুসনদ। প্রথম চিকিৎসা নথি অনুযায়ী, তিনি ২০২৪ সালের ১২ আগস্ট থেকে ১৮ আগস্ট পর্যন্ত রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন ইউনিট-১ বিভাগের ২৯ নম্বর ওয়ার্ডে (বি-১১ শয্যা) চিকিৎসাধীন ছিলেন। সেখান থেকে তাঁকে ঢাকার বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (তৎকালীন বিএসএমএমইউ) রেফার করা হয়।
রংপুর মেডিক্যালের ওই ছাড়পত্রে আশিকুরের রোগ হিসেবে লেখা ছিল, ‘সেপসিস উইথ ফোকাল সিজার (এইচ/ও এনসেফালাইটিস)’ অর্থাৎ চিকিৎসকরা তখন বলেছিলেন, রোগীর শরীরে গুরুতর সংক্রমণ ছিল। এমনকি তাঁর এনসেফালাইটিস বা ব্রেন ইনফেকশনের ইতিহাস ছিল। সেই সঙ্গে তিনি খিঁচুনিজনিত সমস্যায়ও ভুগছিলেন।
রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সেই ছাড়পত্রে কোথাও উল্লেখ নেই, তিনি জুলাই আন্দোলনে মাথায় আঘাত বা সে কারণে কোনো ধরনের ট্রমা, ব্লান্ট ইনজুরিতে আহত ছিলেন। অর্থাৎ চিকিৎসার প্রথম আনুষ্ঠানিক নথিতে তাঁকে একজন সংক্রমণজনিত জটিলতায় আক্রান্ত রোগী হিসেবেই উপস্থাপন করা হয়েছে।
প্রথম ছাড়পত্রের মাত্র কয়েক দিন পর পরিস্থিতি বদলে যায়। মৃত্যুর প্রত্যয়নপত্র অনুযায়ী, আশিককে ২৬ আগস্ট রাত ৯টা ৪০ মিনিটে বিএমইউর আইসিইউ-২-তে ভর্তি করা হয়। এরপর তিনি মারা যান ১ সেপ্টেম্বর দুপুর দেড়টায়। এরপর বিএমইউ থেকে দেওয়া মৃত্যুসনদে আগের চিকিৎসার ইতিহাস হঠাৎ করেই নতুন মোড় নেয়।
ডেথ সার্টিফিকেটে যা বলা হয়েছে
আশিকুর রহমানের মৃত্যুসনদ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, রোগের ঘরে লেখা হয় ‘সেপটিক শক উইথ একেআই উইথ মেনিনগো এনসেফালাইটিস উইথ অ্যালেজড এইচ/ও হেড ইনজুরি ডিউরিং স্টুডেন্ট প্রোটেস্ট’।
অর্থাৎ এখানে নতুনভাবে যুক্ত হয়, সেপটিক শক (গুরুতর সংক্রমণের কারণে শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল হওয়ার মতো সংকটজনক অবস্থা), অ্যাকিউট কিডনি ইনজুরি (হঠাৎ কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া/কিডনি ফেইলিওরের অবস্থা), মেনিনগোএনসেফালাইটিস (মস্তিষ্ক ও মস্তিষ্কের আবরণে প্রদাহ/সংক্রমণ) এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘অ্যালেজড হিস্ট্রি অব হেড ইনজুরি ডিউরিং স্টুডেন্ট প্রোটেস্ট’ অর্থাৎ ছাত্র আন্দোলনের সময় মাথায় আঘাত পাওয়ার অভিযোগ/ইতিহাস ছিল।
এরপর মৃত্যুর কারণে লেখা হয়, ‘ইরিভার্সিবল কার্ডিওরেসপিরেটরি অ্যারেস্ট ডিউ টু অ্যাবাভ মেনশনড ডিজিজেস’। অর্থাৎ উপরোক্ত রোগগুলোর কারণে অপরিবর্তনীয় হৃদযন্ত্র ও শ্বাসযন্ত্র বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মৃত্যু হয়েছে।
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, মৃত্যুসনদে কোনো তথ্য লেখার ক্ষেত্রে চিকিৎসা পর্যবেক্ষণই চূড়ান্ত হওয়া উচিত।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়টির সাবেক একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “মৃত্যুসনদে কোনোভাবেই ‘হেড ইনজুরি ডিউরিং স্টুডেন্ট প্রোটেস্ট’ বা এ জাতীয় কিছু লেখার সুযোগ নেই। সেখানে এর আগে ‘অ্যালেজড’ শব্দ ব্যবহার করলেও এটি সরকারি নথির অংশ হয়ে যায়। পরে সেটি ভিন্নভাবে ব্যবহার হওয়ার ঝুঁকি থাকে।”
তিনি বলেন, এ বিষয়ে ডেথ সার্টিফেকেট প্রদানকারী ডা. মন্তোষের সঙ্গে আমার কথা হয়নি। কিন্তু ঘটনা শুনে এর পেছনে ভিন্ন কিছু বা তৎকালীন সময় কোনো পক্ষের চাপ ছিল বলেই মনে হয়েছে। এ ছাড়া ডেথ সার্টিফিকেটে এমন কিছু তিনি লেখার কথা না।
আর যদি তিনি লিখেও থাকেন, তার পরও তিনিসহ তৎকালীন প্রশাসনকে এ বিষয়ে জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি। কারণ, এমন ঘটনা যে শুধু একটা ঘটেছে তা কিন্তু নিশ্চিত নয়। আমার ধারণা এমন ঘটনা আরো ঘটে থাকতে পারে।
দুই দিন লুকোচুরির পর সেই চিকিৎসকের দায় স্বীকার
রংপুর মেডিক্যালের চিকিৎসাপত্রে ‘ব্রেইন ইনফেকশন’ উল্লেখ থাকলেও বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেথ সার্টিফিকেটে ‘হেড ইনজুরি কিভাবে এলো—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কাজ করছে কালের কণ্ঠ অনুসন্ধানী সেল। (সূত্র-কালের কন্ঠ)।
দৈনিক আস্থা/এমএইচ


















