হত্যা মামলায় বিক্ষত সাংবাদিকতা (১)
- আপডেট সময় : ০৫:২৭:৫২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৮ মে ২০২৬
- / ১০০৬ বার পড়া হয়েছে
হত্যা মামলায় বিক্ষত সাংবাদিকতা (১)
মোফাজ্জল হোসেন ইলিয়াছঃ
ছোট ছোট মিছিল। কিছু উত্তাল তরুণ মুখ। গলা ছেড়ে স্লোগান-‘’তুমি কে, আমি কে-রাজাকার, রাজাকার” ‘’এক দফা, এক দাবি, স্বৈরাচার কবে যাবি’’। মিছিলের সামনে-পেছনে ছুটছেন সাংবাদিকরা।
কেউ ক্যামেরায় বন্দি করছেন উত্তাল মুহূর্ত, কেউ মোবাইল ফোনে পাঠাচ্ছেন লাইভ আপডেট। রাষ্ট্রযন্ত্রের কঠোর নজরদারি, হুমকি, হামলা আর বাধা পেরিয়ে তাঁরাই পৌঁছে দিয়েছেন খবর। কিছু খবর প্রকাশিত হয়েছে, কিছু হারিয়ে গেছে অদৃশ্য সেন্সরের অন্ধকারে। তবু দমে যাননি সাংবাদিকরা।
তারপরও আন্দোলনসহ হত্যাকাণ্ডে একের পর এক মামলা হয়। আর সেসব মামলার আসামির তালিকায় উঠে আসে এমন কিছু নাম, যাঁদের হাতে বন্দুক নয়, ছিল কলম, ক্যামেরা, বুম, মাইক্রোফোন। তাঁরা আর কেউ নন—নিবেদিতপ্রাণ তথ্যসেবক সাংবাদিক।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী দেড় বছরের পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা যায়, যে সাংবাদিক জীবন বাজি রেখে আন্দোলনের খবর সংগ্রহ করেছেন, তিনিই হয়ে গেছেন আসামি। যে মানুষ রাষ্ট্রের দমন-পীড়নের সাক্ষ্য বহন করে মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন, তাঁকেই দাঁড় করানো হয়েছে কাঠগড়ায়। ইতিহাসের এক নির্মম পরিহাসের শিকার হয়ে গেছেন সাংবাদিকরা।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রধান তিনটি স্তম্ভ হলো-আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগ। আর সংবাদমাধ্যম হলো এদের নজরদার, প্রহরী। তাই সংবাদমাধ্যম বা গণমাধ্যমকে বলা হয় রাষ্ট্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’। কিন্তু জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আগে-পরের কিছু বিষয়কে হাতিয়ার বানিয়ে রাষ্ট্রের সেই চতুর্থ স্তম্ভকে পরিকল্পিতভাবে আঘাত করা হয়েছে-এমনটাই মনে করেন আইনবিদসহ বিশিষ্টজনরা।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের শাসনামলে নজিরবিহীন নিগ্রহের শিকার হন সাংবাদিকরা। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় জর্জরিত করা হয় গোটা সংবাদমাধ্যমকে। হত্যা, হত্যাচেষ্টাসহ ৪৯টি মামলায় আসামি করা হয় দেশের অন্তত ২৮২ জন সাংবাদিককে।
এর মধ্যে ১শ ৭৪ জন সাংবাদিক হত্যা মামলা, ১২ জন হত্যাচেষ্টা মামলা, ৩৭ জনকে নাশকতা মামলা মাথায় নিয়ে ঘুরতে হচ্ছে। অনেককে আত্মগোপনে, অনেককে আবার কাটাতে হচ্ছে যাযাবরের জীবন।
ইউনূস জামানার দেড় বছরে সাংবাদিক নিপীড়নের বিষয়ে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের তৈরি গবেষণার তথ্য মতে জানা গেছে, অভ্যুত্থান-পরবর্তী ১৮ মাসে অন্তত ৮শ ১৪ জন সাংবাদিক বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন, হামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)।
সংগঠনটির প্রকাশিত পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত এসব ঘটনা ঘটেছে। নির্যাতিত সাংবাদিকদের মধ্যে বেশি ছিলেন সরাসরি হামলার শিকার। এ সময় ৫শ ৮৫ জন সাংবাদিক হামলার শিকার হন। হত্যা মামলার শিকার হয়েছেন ১শ ৭৪ জন, হত্যাচেষ্টা মামলার শিকার ১২ জন, নাশকতা মামলার শিকার ৩৭ জন এবং সরাসরি হত্যার শিকার হয়েছেন ৬ জন সাংবাদিক।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৫ সালেই সবচেয়ে বেশি সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। ওই বছর ৬শ ২২ জন সাংবাদিক বিভিন্নভাবে নিপীড়নের শিকার হন। এর মধ্যে হামলা করা হয় ৪শ ৫৮ জনকে, হত্যা মামলায় জড়ানো হয় ১শ ৪০ জনকে, নাশকতা মামলার শিকার হন ২১ জন এবং একজন সাংবাদিক নিহত হন।
২০২৪ সালের আগস্ট-ডিসেম্বর সময়ে ১শ ৪৭ জন সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হন। এ সময় ৮৫ জন হামলার শিকার হন, ৩১ জন হত্যা মামলা, ১০ জন হত্যাচেষ্টার মামলা এবং ১৬ জন নাশকতা মামলার শিকার হন। একই সময় ৫ জন সাংবাদিক নিহত হন।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ৪৫ জন সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছে এমএসএফ। এর মধ্যে ৪২ জন হামলার শিকার এবং ৩ জন হত্যা মামলার শিকার হয়েছেন।
এদিকে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ১৭ মাসে অন্তত ৪শ ২৭টি হামলায় ৮শ ৩৪ জন সাংবাদিক নিগ্রহের শিকার হন। এতে ৬ জন নিহত, ৩শ ৭৯ জন আহত, ১শ ৩ জনকে হুমকি ও ৩৩ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। ৪৯টি মামলায় ২শ ২২ জন সাংবাদিককে আসামি করা হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) জানায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ২শ ১৮ জন সাংবাদিক হামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন।
অন্যদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) জানিয়েছে, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ৪শ ৯৬ জন সাংবাদিক হয়রানির শিকার হয়েছেন। ১শ ৮৯ জন সাংবাদিক চাকরিচ্যুত হয়েছেন বলেও তথ্য টিআইবির।
গতকাল আবার সম্পাদক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সদস্য ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম জানিয়েছেন, তাঁরা বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত ২শ ৮২ জন, এর মধ্যে হত্যা মামলায় অভিযুক্ত ৯৪ জন সাংবাদিকের তালিকা প্রতিকারের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে দিয়ে এসেছেন এবং প্রধানমন্ত্রী সেটা ইতিবাচকভাবে নিয়েছেন।
সম্পাদক পরিষদের সঙ্গে বৈঠক শেষে তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, মামলায় অভিযুক্ত সাংবাদিকদের বিষয়টি প্রতিকারের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁকে আগেই নির্দেশ দিয়েছেন।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরশেদ বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে যেসব মামলা হয়েছে সেগুলো প্রমাণ করা কঠিন হবে। ফলে প্রকৃত ভুক্তভোগীর পরিবার ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবে। কারণ ভুল বা কাল্পনিক আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা চলায় বিচার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে।
‘স্বৈরাচারের দোসর’ ট্যাগ দিয়ে হয়রানি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশের আইনে এই নামে কোনো নির্দিষ্ট অপরাধের ধারা নেই এবং এটি মূলত একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত সাংবাদিকদের ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা না নেওয়া হলেও ভবিষ্যতে এমন একটি সময় আসবে যখন তাঁরা তাঁদের ওপর হওয়া এই অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে পারবেন।
দৈনিক আস্থা/এমএইচ



















