নিরাপদ নয় পুলিশ-কতটুক নিরাপদ সাধারণ মানুষ?
Astha DESK
- আপডেট সময় :
১০:২৭:৫১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬
- /
১০২১
বার পড়া হয়েছে
নিরাপদ নয় পুলিশ-কতটুক নিরাপদ সাধারণ মানুষ?
মোফাজ্জল হোসেন ইলিয়াছঃ
বিপদে পড়লে সাধারণ মানুষ নিরাপত্তার জন্য প্রথম আশ্রয় নেয় থানায়। জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা, অপরাধের প্রতিকার কিংবা যেকোনও আইনি সহায়তার জন্য মানুষ পুলিশের কাছেই যায়। কিন্তু সেই থানা ও পুলিশ সদস্যরাই যখন বারবার হামলার লক্ষ্যবস্তু হন, তখন প্রশ্ন ওঠে—পুলিশ নিজেই যদি নিরাপদ না থাকে, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে কে? ঘুরে ফিরে প্রশ্ন এটাই আসছে।
কোথাও রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে, আবার কোথাও গুজব ছড়িয়ে সংঘবদ্ধ জনতাকে উত্তেজিত করে থানায় হামলা চালানো হচ্ছে। এমনকি অভিযানে গিয়েও প্রায়ই আক্রান্ত হচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ১১ জুলাই সন্ধ্যা পর্যন্ত দেশে অন্তত তিনটি থানায় সরাসরি হামলা বা হামলার চেষ্টার খবর পাওয়া গেছে।
আরেকটি ঘটনায় থানার ভেতরেই সাংবাদিক ও ছাত্রনেতাদের ওপর সংঘবদ্ধ হামলার ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ বরিশালের আগৈলঝাড়া থানায় এক আসামির মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে হামলা, ভাঙচুর এবং পুলিশ সদস্যদের মারধরের ঘটনা দেশজুড়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
গত ৯ জুলাই এক আসামির মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে কয়েকশ’ মানুষ বরিশালের আগৈলঝাড়া থানায় আকস্মিক হামলা ও ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। হামলাকারীরা পুলিশ সদস্যদের বেধড়ক মারধর করে। এতে ছয় পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ১২ জন আহত হন।
এর আগে ২২ মে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলা ও ডিম নিক্ষেপের ঘটনায় ঝিনাইদহ সদর থানায় মামলা হয়। মামলার একপর্যায়ে থানার ভেতরে ঢোকার চেষ্টা এবং ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। তবে এ ঘটনায় কোনও পুলিশ সদস্য আহত হননি।
এছাড়া গত ২৫ মার্চ গাইবান্ধার পলাশবাড়ী থানায় ঢুকে ওসিসহ পুলিশ সদস্যদের মারধর করা হয়। এতে থানার ওসিসহ সাত পুলিশ সদস্য আহত হন। অপরদিকে ২৩ এপ্রিল শাহবাগ থানার ভেতরে সাংবাদিক ও ছাত্রনেতাদের ওপর সংঘবদ্ধ হামলার ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় থানা ভবন বা পুলিশ সরাসরি হামলার লক্ষ্য ছিল না। তবে পুলিশের উপস্থিতিতে থানার ভেতরে হামলা হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং থানার নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন ও সদর দফতরের বক্তব্যঃ-
আগৈলঝাড়া থানায় হামলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটি বলেছে, একটি গুজবকে কেন্দ্র করে সংঘটিত এ হামলা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং জননিরাপত্তার জন্য হুমকি। গুজবনির্ভর সংঘবদ্ধ হামলা দেশে গড়ে ওঠা ‘মব সংস্কৃতি’র বহিঃপ্রকাশ। এটি বিচার প্রক্রিয়া, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও জননিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি এবং শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ।
পুলিশ সদর দফতরের ডিআইজি (ক্রাইম ম্যানেজমেন্ট) মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান-এর বক্তব্য হলো, “থানায় বা দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার সময় তাৎক্ষণিকভাবে সব হামলাকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সবসময় সম্ভব হয় না। তবে পরে ভিডিও ফুটেজ এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ করে জড়িতদের শনাক্ত করা হচ্ছে।”
তিনি বলেন, “আগৈলঝাড়া থানায় হামলার ঘটনায় মামলা হয়েছে। ইতোমধ্যে ১৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো গুজবও পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট তদন্ত করছে।” হামলার কারণে পুলিশের সামগ্রিক কার্যক্রমে কোনও প্রভাব পড়ছে না।
এই কর্মকর্তা বলেন, “যেখানে হামলা ঘটে, সেখানে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা সাময়িকভাবে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হতে পারেন। তবে সামগ্রিকভাবে পুলিশের মনোবল অটুট রয়েছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে।”
মনোবল সংকট ও অপরাধ বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণঃ-
দেশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা, আসামি আটক কিংবা সংঘর্ষ থামাতে গিয়েও নিয়মিত হামলার শিকার হচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে থানায় হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও অস্ত্র লুটের ঘটনা ঘটে। হামলায় বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য নিহত হন। ওই পরিস্থিতির পর দীর্ঘ সময় ধরে পুলিশ সদস্যদের মনোবল ও কার্যক্রম স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ আরও সক্রিয়ভাবে কাজ শুরু করেছে। কিন্তু এর মধ্যেই থানায় হামলা ও পুলিশ সদস্যদের মারধরের ঘটনা বাহিনীর মধ্যে নতুন করে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, “আগৈলঝাড়া থানায় হামলা এবং পুলিশ সদস্যদের মারধরের ঘটনায় জড়িতদের যত দ্রুত সম্ভব আইনের আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও হুমকির মুখে পড়তে পারে। বাংলাদেশ পুলিশ দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করে। সেই বাহিনীর সদস্যদের থানায় গিয়ে হামলা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ঘটনার পেছনে যে কারণই থাকুক, হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।”
ড. তৌহিদুল হক বলেন, “২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটে। এসবের প্রভাবে বাহিনীর মনোবল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। দীর্ঘ সময় পর পুলিশ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরছিল। এমন সময় আবার থানায় হামলা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মনোবল অটুট রাখা এবং পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা বজায় রাখতে হামলাকারীদের দ্রুত শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোঃ রেজাউল করিম বলেন, “আগস্ট-পরবর্তী সময়ে পুলিশের প্রতি মানুষের অবিশ্বাস এবং বাহিনীকে দুর্বল করার প্রবণতার কারণে বিভিন্ন স্থানে পুলিশ আক্রান্ত হচ্ছে। বলেন, “পুলিশের কোনও সদস্য অপরাধ করলে অবশ্যই তার বিচার হবে। কিন্তু কয়েকজনের অপরাধের জন্য পুরো বাহিনীকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দুর্বল করা দেশের জন্য শুভ নয়। রাজনৈতিক দল ও অন্যান্য অংশীজনকে পুলিশকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার কিংবা আক্রমণ না করে পেশাদার বাহিনী হিসেবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।”
তিনি বলেন, “পুলিশকে দুর্বল করে কোনও রাষ্ট্র অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। পুলিশ যথাযথভাবে কাজ করতে না পারলে অপরাধপ্রবণ ব্যক্তি ও গোষ্ঠী আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে। তারা পুলিশের গতিবিধি ও সক্ষমতা পর্যবেক্ষণ করে। পুলিশ আক্রান্ত হচ্ছে কিংবা কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছে না। এমন ধারণা তৈরি হলে অপরাধীরা আরও উৎসাহিত হবে। পুলিশের মনোবল বাড়ানোর পাশাপাশি জনগণের সঙ্গে বাহিনীর সম্পর্কও উন্নত করতে হবে। এ জন্য জনবল, যানবাহন ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামসহ লজিস্টিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে পুলিশের জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।”
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু পুলিশের মনোবল অটুট থাকার মৌখিক ঘোষণাই যথেষ্ট নয়। থানায় হামলা ও সহিংসতার ঘটনায় দ্রুত ও দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত করতে না পারলে রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগের সক্ষমতাই প্রশ্নের মুখে পড়বে। (সূত্র-বাংলা ট্রিবিউন)।
দৈনিক আস্থা/এমএইচ
-
সর্বশেষ সংবাদ
-
জনপ্রিয় সংবাদ