ঢাকা ০৩:২০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২৬, ২০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এনায়েতপুর থানা হামলায় ১৫ পুলিশ হত্যা; উদ্ধার হয়নি লুট হওয়া অস্ত্র

Astha DESK
  • আপডেট সময় : ০১:১৭:৫২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬
  • / ১০০৫ বার পড়া হয়েছে

এনায়েতপুর থানা হামলায় ১৫ পুলিশ হত্যা; উদ্ধার হয়নি লুট হওয়া অস্ত্র

মোফাজ্জল হোসেন ইলিয়াছঃ

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের এক দফা চলাকালে ২০২৪ সালের ৪ অগাস্ট সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায় হামলা চালিয়ে ১৫ পুলিশ সদস্যকে হত্যা করা হয়। এ সময় থানা থেকে প্রচুর অস্ত্র লুটপাট করা হয়। এসব অস্ত্রের সব এখনও উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ।

একই দিনে হাটিকুমরুল হাইওয়ে থানাও হামলার ঘটনা ঘটে। সেখানেও অস্ত্র লুটের ঘটনা ঘটে। সেই থানার সব অস্ত্র এখনও উদ্ধার হয়নি বলে পুলিশ জানিয়েছে।

আওয়ামী লীগ সরকার পতনের একদিন আগে সিরাজগঞ্জে ব্যাপক সংঘর্ষ, গোলাগুলি, হামলা, অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। একদিনেই ১৫ পুলিশ সদস্যসহ ২৯ জনের প্রাণহানি হয়।

ঘটনার দুই বছর পেরিয়ে এখনও প্রত্যক্ষদর্শীরা সেই দিনের ভয়াবহতার কথা ভুলতে পারেননি। থানা থেকে পালিয়ে যারা আশপাশের বাড়িঘরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাদেরকে সেদিন বাড়িঘর থেকে খুঁজে খুঁজে বের করে হত্যা করা হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন।

এনায়েতপুর থানায় অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর, অস্ত্র-গুলি লুট এবং ১৫ পুলিশ সদস্য হত্যার ঘটনার ২১ দিন পর মামলা করে পুলিশ। সেই মামলার এজাহারে বলা হয়, হামলার সময় পাঁচটি পিস্তল ও আটটি ম্যাগাজিন, একটি চায়না পিস্তল ও দুইটি ম্যাগাজিন, চারটি চায়না রাইফেল ও ৩৭টি চার্জার, দুইটি চায়না রাইফেল ও দুইটি ম্যাগাজিন, ছয়টি ১২ বোরের শর্টগান, একটি ৩৮ মিমি গ্যাস গান লঞ্চার, ৭.৬২৩৯ মিমি গুলি ১৬৮টি, ৭.৬২২৫ মিমি গুলি ১৬টি, ৯১৯ মিমি গুলি ৬০টি, ১২ বোরের শটগানের (রাবার কার্তুজ) গুলি ২২৭টি, ১২ বোরের শর্টগানের (লেটবল কার্তুজ) ৩৫৯টি, লং রেঞ্জ গ্যাস শেল ৩৮টি এবং শর্ট রেঞ্জের ৩৬টি গ্যাস শেল লুট করে নিয়ে যায়।

এ ছাড়া এদিন থানার অভ্যন্তরে থাকা একটি ডাবল কেবিন ও একটি সিঙ্গেল কেবিনের পুলিশ পিকআপ, পুলিশ সদস্যদের ব্যবহৃত ১৫টি মোটরসাইকেল ও একটি ট্রাক এবং বিভিন্ন সময় জব্দ করা নতুন ও পুরাতন ১২টি মোটরসাইকেল, নথি, আসবাবপত্র, কম্পিউটার ও ওয়াকিটকি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

এখন পর্যন্ত চারজন কর্মকর্তা মামলাটি তদন্ত করেছেন। চতুর্থ তদন্ত কর্মকর্তা ও এনায়েতপুর থানার এসআই ফরিদ উদ্দিন বলেন, “লুট হওয়া একটি রাইফেল, চারটি পিস্তুল ও একটি শটগান- এই ছয়টি আগ্নেয়াস্ত্র এখনও উদ্ধার হয়নি।”

এ ছাড়া সিরাজগঞ্জের সলঙ্গায় অবস্থিত হাটিকুমরুল হাইওয়ে থানার আটটি আগ্নেয়াস্ত্র এখনও উদ্ধার হয়নি বলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সলঙ্গা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মনোজিত কুমার নন্দী জানান।

তিনি বলেন, ৪ অগাস্ট থানায় হামলার সময় ২৫টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়। এরমধ্যে ১৭টি উদ্ধার হলেও এখনও আটটি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয়নি।

পুলিশ জানায়, হাটিকুমরুল হাইওয়ে থানায় হামলার মামলায় এ পর্যন্ত ১৩ জনকে এবং এনায়েতপুর থানায় হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় নয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

পানির ট্যাংকে লুকিয়ে ছিলেন ১০ পুলিশ’

এনায়েতপুর এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা দবির মণ্ডলের ছেলে সুজাব মণ্ডল (৪৫) থানার সামনে চায়ের দোকান করেন। ২০২৪ সালের ৪ অগাস্ট থানায় হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী তিনি। সেদিনের ভয়াবহতার কথা মনে হলে এখনও আতঙ্কবোধ করেন তিনি।

সেদিনের কথা মনে করে সুজাব মণ্ডল বলেন, সকাল ১০টার দিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একটি মিছিল থানার সামনে এসে বিক্ষোভ করতে থাকে। পুলিশ আগে থেকেই অবস্থান নিয়ে ছিল। ছাত্রদের ছত্রভঙ্গ করতে থানা থেকে গুলি করা হয়। এতে এক ছাত্র আহত হন।

এ খবর ছড়িয়ে পড়তেই মুহূর্তের মধ্যে সেখানে হাজার হাজার লোক জড়ো হয়ে যায়। তারা লাঠিসোঁটা ও ইট-পাটকেল নিয়ে পুলিশের ওপর আক্রমণ করে। পাশাপাশি আশপাশের দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালাতে থাকে। প্রতিরোধ করতে গিয়ে পুলিশও গু/দলি ও কাঁদুনে গ্যাস নিক্ষেপ করে। এ সময় তিন আন্দোলনকারী নিহত হন।

এরপর আন্দোলনকারীরা আরও উত্তেজিত হয়ে ওঠে। হাজার হাজার মানুষের হামলার মুখে একপর্যায়ে পুলিশ থানা থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। তখন তাদের ধরে ধরে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

সুজাব মণ্ডল বলেন, সারাদিনই এমন ঘটনা ঘটে। সন্ধ্যায় সেনাবাহিনী একটি বিশাল দল ঘটনাস্থলে আসেন। তারা মাইকে ঘোষণা দেওয়ার পর থানার ছাদের পানির ট্যাংকিতে লুকিয়ে থাকা ৯-১০ পুলিশ সদস্য বের হয়ে আসেন।

উঠান-পুকুর-রাস্তায় পড়ে ছিল লাশ’

আন্দোলনকারীদের হামলার সময় এনায়েতপুর থানার পূর্ব দিকের পেছনের গেইট এবং উত্তর পাশের ভাঙা সীমানা প্রাচীর দিয়ে অনেক পুলিশ সদস্য পালিয়ে যান। তারা পাশের তাঁতশ্রমিক বাবলু ওরফে বাবু, কাজী নজরুল ইসলাম ও মো. শহিদের বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেন।

ষাটোর্ধ্ব বাবলু তাঁতি বলেন, “আমার বাড়ির বাথরুমে এসে ১০-১২ পুলিশ সদস্য আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাদের সেখান থেকে ধরে ধরে এনে বাড়ি উঠানে পি/টিয়ে হত্যা করেছে। ওসিকে হত্যার পর লাশ পুকুরে ফেলে দেয়। বাড়ির আশপাশে লাশ পড়েছিল। বাড়ির মহিলারা ভয়ে একটি ঘরে দরজা বন্ধ করে বসেছিলেন।

“পরে বাইরে বেরিয়ে দেখি, তিন-চারজনের তখনও প্রাণ ছিল। তাদের শরীরে কোনো পোশাক ছিল না। আমরা কাপড়-চোপড় দেই এবং তাদের নিরাপদে অন্য জায়গায় পাঠিয়ে দেই।”

এ ঘটনার পর থেকেই মানসিক অসুস্থতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন বাবলু তাঁতির স্ত্রী মঞ্জুয়ারা খাতুন। সেদিনের ভয় এখনও কাটেনি তার। নিয়মিত চিকিৎসকের কাছে যেতে হয়।

মঞ্জুয়ারা খাতুন বলেন, “বাড়ির ভেতর এমন ভয়াবহ দৃশ্য দেখে আমরা অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। আমরা প্রায় ছয় মাস দিনের বেলায় নিজের বাড়িতে আসিনি। অন্যের বাড়িতে সময় কাটাতাম। শুধু রাতের বেলায় বাড়িতে এসে থাকতাম, তবু ভয় করত।”

পাশের বাড়ির কাজী নজরুল ইসলাম বলেন, তাদের বাড়িতে তিন-চার পুলিশ সদস্য এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে কেউ হামলা করেননি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পর পুলিশ সদস্যরা চলে যান।

সাক্ষী পোড়া যানবাহন

এনায়েতপুর থানায় হামলা, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও পুলিশ হত্যার পর থানাটি পরিত্যক্ত হয়ে যায়। ১৮ দিন পর পাশের একটি ভবন ভাড়া নিয়ে থানার কার্যক্রম চালু হয়। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত সেখানেই থানার কার্যক্রম চলতে থাকে। থানা ভবন, সীমানা প্রাচীর ও অন্যান্য স্থাপনা সংস্কার করার পর গত বছরের মে মাস থেকে পুরাতন ভবনে আবরও থানার কার্যক্রম চালু হয়।

সম্প্রতি থানায় গিয়ে দেখা যায়, ভবনগুলোর সেই পোড়া চিহৃ আর নেই। রংয়ের প্রলেপে সব কিছু ঢেকে গেছে। থানার অভ্যন্তরে একটি স্থানে পোড়া যানবাহনগুলো স্তূপ করে রাখা হয়েছে। হামলার সময় দায়িত্ব পালন করা কোনো পুলিশ সদস্যই এখন আর সেখানে নেই।

এনায়েতপুর থানার ওসি জাহিদ হোসেন বলেন, হামলার পর থানায় তিনজন ওসি দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর তিনি এখানে যোগদান করেছেন। বর্তমানে থানার জনবল ও যানবাহন স্বাভাবিক রয়েছে। কার্যক্রমও সঠিকভাবে চলছে।

“পিকআপ, মোটরসাইকেলসহ পোড়া অন্যান্য জিনিস মামলার আলামত হিসেবে একটি স্থানে স্তূপ করে রাখা হয়েছে।”

ঘটনার ২১ দিন পর ২৫ অগাস্ট রাতে এনায়েতপুর থানার এসআই আব্দুল মালেক বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। মামলার এজাহারে বলা হয়, পূর্ব ক্ষোভের কারণে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা এই হামলা চালায়। মামলায় আওয়ামী লীগের চার নেতার নাম দিয়ে অজ্ঞাত পাঁচ থেকে ছয় হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়।

অপরদিকে বিএনপির ৩ নেতাকর্মী নিহতের ঘটনায় দায়ের হওয়া তিনটি মামলার ২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। তিনটি মামলায় মোট ৫৪৯ জনকে আসামি করা হয়েছে।

প্রতিটি মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা, সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে হুকুমের আসামি করা হয়েছে।

তবে রায়গঞ্জ উপজেলায় ৫ আওয়ামী লীগ নেতা ও সাংবাদিক হত্যার ঘটনায় আজও কোনো মামলা হয়নি।

দৈনিক আস্থা/এমএইচ

ট্যাগস :

এনায়েতপুর থানা হামলায় ১৫ পুলিশ হত্যা; উদ্ধার হয়নি লুট হওয়া অস্ত্র

আপডেট সময় : ০১:১৭:৫২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬

এনায়েতপুর থানা হামলায় ১৫ পুলিশ হত্যা; উদ্ধার হয়নি লুট হওয়া অস্ত্র

মোফাজ্জল হোসেন ইলিয়াছঃ

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের এক দফা চলাকালে ২০২৪ সালের ৪ অগাস্ট সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায় হামলা চালিয়ে ১৫ পুলিশ সদস্যকে হত্যা করা হয়। এ সময় থানা থেকে প্রচুর অস্ত্র লুটপাট করা হয়। এসব অস্ত্রের সব এখনও উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ।

একই দিনে হাটিকুমরুল হাইওয়ে থানাও হামলার ঘটনা ঘটে। সেখানেও অস্ত্র লুটের ঘটনা ঘটে। সেই থানার সব অস্ত্র এখনও উদ্ধার হয়নি বলে পুলিশ জানিয়েছে।

আওয়ামী লীগ সরকার পতনের একদিন আগে সিরাজগঞ্জে ব্যাপক সংঘর্ষ, গোলাগুলি, হামলা, অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। একদিনেই ১৫ পুলিশ সদস্যসহ ২৯ জনের প্রাণহানি হয়।

ঘটনার দুই বছর পেরিয়ে এখনও প্রত্যক্ষদর্শীরা সেই দিনের ভয়াবহতার কথা ভুলতে পারেননি। থানা থেকে পালিয়ে যারা আশপাশের বাড়িঘরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাদেরকে সেদিন বাড়িঘর থেকে খুঁজে খুঁজে বের করে হত্যা করা হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন।

এনায়েতপুর থানায় অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর, অস্ত্র-গুলি লুট এবং ১৫ পুলিশ সদস্য হত্যার ঘটনার ২১ দিন পর মামলা করে পুলিশ। সেই মামলার এজাহারে বলা হয়, হামলার সময় পাঁচটি পিস্তল ও আটটি ম্যাগাজিন, একটি চায়না পিস্তল ও দুইটি ম্যাগাজিন, চারটি চায়না রাইফেল ও ৩৭টি চার্জার, দুইটি চায়না রাইফেল ও দুইটি ম্যাগাজিন, ছয়টি ১২ বোরের শর্টগান, একটি ৩৮ মিমি গ্যাস গান লঞ্চার, ৭.৬২৩৯ মিমি গুলি ১৬৮টি, ৭.৬২২৫ মিমি গুলি ১৬টি, ৯১৯ মিমি গুলি ৬০টি, ১২ বোরের শটগানের (রাবার কার্তুজ) গুলি ২২৭টি, ১২ বোরের শর্টগানের (লেটবল কার্তুজ) ৩৫৯টি, লং রেঞ্জ গ্যাস শেল ৩৮টি এবং শর্ট রেঞ্জের ৩৬টি গ্যাস শেল লুট করে নিয়ে যায়।

এ ছাড়া এদিন থানার অভ্যন্তরে থাকা একটি ডাবল কেবিন ও একটি সিঙ্গেল কেবিনের পুলিশ পিকআপ, পুলিশ সদস্যদের ব্যবহৃত ১৫টি মোটরসাইকেল ও একটি ট্রাক এবং বিভিন্ন সময় জব্দ করা নতুন ও পুরাতন ১২টি মোটরসাইকেল, নথি, আসবাবপত্র, কম্পিউটার ও ওয়াকিটকি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

এখন পর্যন্ত চারজন কর্মকর্তা মামলাটি তদন্ত করেছেন। চতুর্থ তদন্ত কর্মকর্তা ও এনায়েতপুর থানার এসআই ফরিদ উদ্দিন বলেন, “লুট হওয়া একটি রাইফেল, চারটি পিস্তুল ও একটি শটগান- এই ছয়টি আগ্নেয়াস্ত্র এখনও উদ্ধার হয়নি।”

এ ছাড়া সিরাজগঞ্জের সলঙ্গায় অবস্থিত হাটিকুমরুল হাইওয়ে থানার আটটি আগ্নেয়াস্ত্র এখনও উদ্ধার হয়নি বলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সলঙ্গা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মনোজিত কুমার নন্দী জানান।

তিনি বলেন, ৪ অগাস্ট থানায় হামলার সময় ২৫টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়। এরমধ্যে ১৭টি উদ্ধার হলেও এখনও আটটি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয়নি।

পুলিশ জানায়, হাটিকুমরুল হাইওয়ে থানায় হামলার মামলায় এ পর্যন্ত ১৩ জনকে এবং এনায়েতপুর থানায় হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় নয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

পানির ট্যাংকে লুকিয়ে ছিলেন ১০ পুলিশ’

এনায়েতপুর এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা দবির মণ্ডলের ছেলে সুজাব মণ্ডল (৪৫) থানার সামনে চায়ের দোকান করেন। ২০২৪ সালের ৪ অগাস্ট থানায় হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী তিনি। সেদিনের ভয়াবহতার কথা মনে হলে এখনও আতঙ্কবোধ করেন তিনি।

সেদিনের কথা মনে করে সুজাব মণ্ডল বলেন, সকাল ১০টার দিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একটি মিছিল থানার সামনে এসে বিক্ষোভ করতে থাকে। পুলিশ আগে থেকেই অবস্থান নিয়ে ছিল। ছাত্রদের ছত্রভঙ্গ করতে থানা থেকে গুলি করা হয়। এতে এক ছাত্র আহত হন।

এ খবর ছড়িয়ে পড়তেই মুহূর্তের মধ্যে সেখানে হাজার হাজার লোক জড়ো হয়ে যায়। তারা লাঠিসোঁটা ও ইট-পাটকেল নিয়ে পুলিশের ওপর আক্রমণ করে। পাশাপাশি আশপাশের দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালাতে থাকে। প্রতিরোধ করতে গিয়ে পুলিশও গু/দলি ও কাঁদুনে গ্যাস নিক্ষেপ করে। এ সময় তিন আন্দোলনকারী নিহত হন।

এরপর আন্দোলনকারীরা আরও উত্তেজিত হয়ে ওঠে। হাজার হাজার মানুষের হামলার মুখে একপর্যায়ে পুলিশ থানা থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। তখন তাদের ধরে ধরে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

সুজাব মণ্ডল বলেন, সারাদিনই এমন ঘটনা ঘটে। সন্ধ্যায় সেনাবাহিনী একটি বিশাল দল ঘটনাস্থলে আসেন। তারা মাইকে ঘোষণা দেওয়ার পর থানার ছাদের পানির ট্যাংকিতে লুকিয়ে থাকা ৯-১০ পুলিশ সদস্য বের হয়ে আসেন।

উঠান-পুকুর-রাস্তায় পড়ে ছিল লাশ’

আন্দোলনকারীদের হামলার সময় এনায়েতপুর থানার পূর্ব দিকের পেছনের গেইট এবং উত্তর পাশের ভাঙা সীমানা প্রাচীর দিয়ে অনেক পুলিশ সদস্য পালিয়ে যান। তারা পাশের তাঁতশ্রমিক বাবলু ওরফে বাবু, কাজী নজরুল ইসলাম ও মো. শহিদের বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেন।

ষাটোর্ধ্ব বাবলু তাঁতি বলেন, “আমার বাড়ির বাথরুমে এসে ১০-১২ পুলিশ সদস্য আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাদের সেখান থেকে ধরে ধরে এনে বাড়ি উঠানে পি/টিয়ে হত্যা করেছে। ওসিকে হত্যার পর লাশ পুকুরে ফেলে দেয়। বাড়ির আশপাশে লাশ পড়েছিল। বাড়ির মহিলারা ভয়ে একটি ঘরে দরজা বন্ধ করে বসেছিলেন।

“পরে বাইরে বেরিয়ে দেখি, তিন-চারজনের তখনও প্রাণ ছিল। তাদের শরীরে কোনো পোশাক ছিল না। আমরা কাপড়-চোপড় দেই এবং তাদের নিরাপদে অন্য জায়গায় পাঠিয়ে দেই।”

এ ঘটনার পর থেকেই মানসিক অসুস্থতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন বাবলু তাঁতির স্ত্রী মঞ্জুয়ারা খাতুন। সেদিনের ভয় এখনও কাটেনি তার। নিয়মিত চিকিৎসকের কাছে যেতে হয়।

মঞ্জুয়ারা খাতুন বলেন, “বাড়ির ভেতর এমন ভয়াবহ দৃশ্য দেখে আমরা অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। আমরা প্রায় ছয় মাস দিনের বেলায় নিজের বাড়িতে আসিনি। অন্যের বাড়িতে সময় কাটাতাম। শুধু রাতের বেলায় বাড়িতে এসে থাকতাম, তবু ভয় করত।”

পাশের বাড়ির কাজী নজরুল ইসলাম বলেন, তাদের বাড়িতে তিন-চার পুলিশ সদস্য এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে কেউ হামলা করেননি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পর পুলিশ সদস্যরা চলে যান।

সাক্ষী পোড়া যানবাহন

এনায়েতপুর থানায় হামলা, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও পুলিশ হত্যার পর থানাটি পরিত্যক্ত হয়ে যায়। ১৮ দিন পর পাশের একটি ভবন ভাড়া নিয়ে থানার কার্যক্রম চালু হয়। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত সেখানেই থানার কার্যক্রম চলতে থাকে। থানা ভবন, সীমানা প্রাচীর ও অন্যান্য স্থাপনা সংস্কার করার পর গত বছরের মে মাস থেকে পুরাতন ভবনে আবরও থানার কার্যক্রম চালু হয়।

সম্প্রতি থানায় গিয়ে দেখা যায়, ভবনগুলোর সেই পোড়া চিহৃ আর নেই। রংয়ের প্রলেপে সব কিছু ঢেকে গেছে। থানার অভ্যন্তরে একটি স্থানে পোড়া যানবাহনগুলো স্তূপ করে রাখা হয়েছে। হামলার সময় দায়িত্ব পালন করা কোনো পুলিশ সদস্যই এখন আর সেখানে নেই।

এনায়েতপুর থানার ওসি জাহিদ হোসেন বলেন, হামলার পর থানায় তিনজন ওসি দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর তিনি এখানে যোগদান করেছেন। বর্তমানে থানার জনবল ও যানবাহন স্বাভাবিক রয়েছে। কার্যক্রমও সঠিকভাবে চলছে।

“পিকআপ, মোটরসাইকেলসহ পোড়া অন্যান্য জিনিস মামলার আলামত হিসেবে একটি স্থানে স্তূপ করে রাখা হয়েছে।”

ঘটনার ২১ দিন পর ২৫ অগাস্ট রাতে এনায়েতপুর থানার এসআই আব্দুল মালেক বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। মামলার এজাহারে বলা হয়, পূর্ব ক্ষোভের কারণে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা এই হামলা চালায়। মামলায় আওয়ামী লীগের চার নেতার নাম দিয়ে অজ্ঞাত পাঁচ থেকে ছয় হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়।

অপরদিকে বিএনপির ৩ নেতাকর্মী নিহতের ঘটনায় দায়ের হওয়া তিনটি মামলার ২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। তিনটি মামলায় মোট ৫৪৯ জনকে আসামি করা হয়েছে।

প্রতিটি মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা, সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে হুকুমের আসামি করা হয়েছে।

তবে রায়গঞ্জ উপজেলায় ৫ আওয়ামী লীগ নেতা ও সাংবাদিক হত্যার ঘটনায় আজও কোনো মামলা হয়নি।

দৈনিক আস্থা/এমএইচ