মার্জিন ঋণের শর্তে ‘আতঙ্ক’ পুঁজিবাজারে বড় পতন
- আপডেট সময় : ০২:১৭:৫৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬
- / ৯৯৭ বার পড়া হয়েছে
মার্জিন ঋণের শর্তে ‘আতঙ্ক’ পুঁজিবাজারে বড় পতন
আহসান হাবিবঃ
পুঁজিবাজারে লেনদেন বাড়ানো ও তারল্য সংকট কাটাতে মার্জিন ঋণের নিয়ম সহজ করার উদ্যোগ নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। তবে প্রস্তাবিত সংশোধনীতে যুক্ত ‘পিবি রেশিও’ (প্রাইস টু বুক ভ্যালু) শর্ত নিয়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।
বিশেষ করে বীমা খাতের বেশিরভাগ কোম্পানি মার্জিন ঋণের সুবিধার বাইরে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বাজারে। সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস গতকাল বৃহস্পতিবার দেশের শেয়ারবাজারে বড় দরপতন হয়েছে। প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক কমেছে ৬৬ পয়েন্ট।
বাজার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মার্জিন ঋণের নতুন শর্ত নিয়ে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিক্রির চাপ বেড়েছে। যদিও বিএসইসি জানিয়েছে, প্রস্তাবিত বিধিমালা এখনো চূড়ান্ত হয়নি এবং অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে বিষয়টি পর্যালোচনা করা হবে।
দিন শেষে ডিএসইতে তালিকাভুক্ত ৩৮৯টি প্রতিষ্ঠান, মিউচুয়াল ফান্ড ও বন্ডের মধ্যে ৫৯টির দাম বেড়েছে। কমেছে ৩১০টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ২০টির দাম।
বড় দরপতনের ফলে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ৬৬ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৮০৪ পয়েন্টে নেমে এসেছে। এ ছাড়া ডিএসই-৩০ সূচক কমেছে ২৩ পয়েন্ট এবং ডিএসই শরিয়াহ সূচক কমেছে ১৬ পয়েন্ট।
সূচকের পাশাপাশি কমেছে লেনদেনও। ডিএসইতে লেনদেন হয়েছে ৯৩৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। আগের কার্যদিবসে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ২১১ কোটি ১৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক দিনের ব্যবধানে লেনদেন কমেছে ২৭২ কোটি ২৫ লাখ টাকা।
লেনদেনে শীর্ষে ছিল শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ। কোম্পানিটির ৩৪ কোটি ৬২ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। এরপর সিটি ব্যাংকের ২৩ কোটি ২৪ লাখ এবং এমএল ডাইংয়ের ১৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই কমেছে ১৫৮ পয়েন্ট। এদিন সিএসইতে লেনদেনে অংশ নেওয়া ২৬২ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৫৪টির দাম বেড়েছে, কমেছে ১৮৬টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ২২টির দাম। লেনদেন হয়েছে ২০ কোটি ১৩ লাখ টাকা।
বিএসইসির প্রস্তাবিত ‘মার্জিন বিধিমালা, ২০২৫’-এর সংশোধনীতে বলা হয়েছে, বীমা কোম্পানির ‘পিবি রেশিও’ ১-এর বেশি হলে ওই প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে মার্জিন ঋণ দেওয়া যাবে না। অর্থাৎ কোনো বীমা কোম্পানির বাজারমূল্য যদি তার শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য বা এনএভিপিএসের চেয়ে বেশি হয়, তাহলে সেই শেয়ারে ঋণ সুবিধা পাওয়া যাবে না।
বাজার-সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ৫৮টি বীমা কোম্পানির মধ্যে মাত্র সাত থেকে আটটি প্রতিষ্ঠান এই শর্ত পূরণ করতে পারে। ফলে অধিকাংশ বীমা কোম্পানির শেয়ারে মার্জিন ঋণ বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ‘পিবি রেশিও’ সীমা ৩ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে তেমন বড় সমস্যা হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমান বিধিমালায় অন্তত ৫ শতাংশ লভ্যাংশ দেওয়া বি ক্যাটাগরির কোম্পানির শেয়ার কেনার জন্যই কেবল মার্জিন ঋণ নেওয়া যায়। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে এই শর্ত তুলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ফলে ৫ শতাংশের কম, এমনকি আরও কম লভ্যাংশ দেওয়া কোম্পানির শেয়ার কেনার ক্ষেত্রেও মার্জিন ঋণ নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে। এ ছাড়া মার্জিন ঋণের জন্য ন্যূনতম বিনিয়োগের সীমা ৫ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে ৩ লাখ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে আরও বেশি বিনিয়োগকারী মার্জিন ঋণের আওতায় আসতে পারবেন।
বাজার বিশ্লেষকেরা বলছেন, বীমা খাতের বেশিরভাগ কোম্পানি নিয়মিত লভ্যাংশ দিয়ে আসছে। পাশাপাশি কোম্পানিগুলোর আকার তুলনামূলক ছোট হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বেশি। এ কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর অনেক ক্ষেত্রে নিট সম্পদমূল্যের চেয়ে বেশি অবস্থানে রয়েছে।
বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান কালবেলাকে বলেন, নতুন কোনো বিষয় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলে শুরুতে অনেক সময় তা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। ‘পিই রেশিও’ দীর্ঘদিনের পরিচিত হলেও ‘পিবি রেশিও’ অনেকের কাছে নতুন। ‘পিবি রেশিও’ আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত একটি পদ্ধতি। তবে বিষয়টি নিয়ে অংশীজনের মতামত নেওয়া হচ্ছে। এটি কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়।
তিনি বলেন, বাজার যদি বিষয়টি বুঝতে না পারে বা এর কারণে নেতিবাচক প্রভাব তৈরি হয়, তাহলে অবশ্যই আমরা এটি পর্যালোচনা করব। আমাদের কমিশন বাজারবান্ধব। বিনিয়োগকারীদের ওপর কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়া হবে না।
তবে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম মনে করেন, সাম্প্রতিক দরপতনকে স্বাভাবিক মূল্য সমন্বয় হিসেবে দেখা উচিত। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন স্থিতিশীল এবং অর্থনীতিও ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। বাজারে বড় পতনের মতো কোনো অভ্যন্তরীণ বা বাহ্যিক সংকট তৈরি হয়নি।
কাওসার আলম নামের একজন বিনিয়োগকারী বলেন, নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর বাজারে কিছুটা আস্থা ফিরেছিল। কিন্তু মার্জিন ঋণের খসড়া প্রস্তাবে কিছুটা আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। বাজারে কোনো কারসাজি চক্র সক্রিয় আছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।



















